—আমার বৃষ্টি দেখতে খুব ভালো লাগে।
যন্ত্রণার ঝাপসা দৃষ্টির মধ্যে কথাগুলো কেউ ছুঁতে চাইলো। ট্রেন ধীরে ধীরে মগ্নচৈতন্যের প্ল্যাটফর্মে ঢুকবে, এমন সময় সিগন্যাল পাওয়া যাচ্ছে না। ট্রেন দাঁড়িয়ে পড়লো।
—ব্যথানগরীর কবির কাছে কী পাও?
আক্রোশ দাঁত খুঁটতে খুঁটতে বললো।
—শব্দরা কেমন রক্ত-মাংসের অবয়ব নিয়ে আমার কাছে এসে বসে। বাস্তব তখন আলো-ছায়া মাখা, মায়ামায়া কাঁচীয় তরল। ঘেঁটে যায় অঘোরে।
—আহ্! তুমি কোন ভাষায় কথা বলছো বলো তো?
—অনুভূতির ভাষায়। যেখানে অনুভূতি সত্য, সেখানে বাস্তব আর কল্পনার কোনো বিভাজন থাকে না।
—এই তো কেলো করলে! (পরিসংখ্যানবিদ কান চুলকাতে চুলকাতে বললো) ডেটা ছাড়া সত্যি প্রকাশ করা যায় না। অনুভূতি ভ্যারিয়েবল, স্থির নয়।
এমন সময় আবার ট্রেন চলতে শুরু করে।
—দেখ, জানালার বাইরে যে দৃশ্য যাচ্ছে, তা একই সঙ্গে ঘটছে আর হারিয়ে যাচ্ছে। কোথাও কোনো কিছু স্থির নেই।
এনট্রপি বৃদ্ধের কথায় আক্রোশ তেড়েফুঁড়ে আক্রমণ করে বসে—
—রাখুন তো দর্শন আর ভ্যারিয়েবল! এই যে দেখছেন আতঙ্ক, আর এই যে দেখছেন আক্রোশ—এরা দুজন আসল সত্য। কারণ এরা হলো ক্ষমতাবান। আমরা দুজনেই ক্ষমতা। তাই আমরাই সত্যি। যন্ত্রণা, ব্যথা—এসব হাবিজাবি আমরা না থাকলে ফুৎকারে হাওয়া।
—ট্রেনটা চলছে তবু পৌঁছচ্ছে না কেন?
মগ্নচৈতন্যের প্ল্যাটফর্মে কিছু একটা ঘটেছে। এনট্রপি বৃদ্ধ জানালার কাছে গিয়ে গন্ধ শুঁকে বললো।
—ও বাবা! শুঁকেই বলে দিলেন? যত সব ঢপের চপ।
এনট্রপি বৃদ্ধের কটমট দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে উদ্বেগ বলে উঠলো—
—আবার বাওয়াল করছো কেন আতঙ্কদা? এই বৃদ্ধ খুব সুবিধের নয়। বলছে, বলতে দাও না!
উদ্বেগের ভিতরে এক টানটান ভাব। সে নিজেই জানে না কাকে সে শান্ত করতে চাইছে—আতঙ্ককে, না নিজের ভিতরের কাঁপনকে। এনট্রপি বৃদ্ধ কঠিন চোখে বলে উঠলো—
—ভাঙনের গন্ধ, ভাঙচুরের গন্ধ পাচ্ছি। কোথাও কিছু থেমে নেই, কিন্তু এগোচ্ছে না। ট্রেন চলছে, কিন্তু দৃশ্য বদলাচ্ছে না।
—ট্রেন চলছে, কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছচ্ছে না—এটা তো লজিক্যালি সম্ভব নয়। কোথাও টাইম সিরিজের ডেটা লস হয়েছে।
পরিসংখ্যানবিদের গলায় সংখ্যার ভরসাও টলোমলো। যন্ত্রণা বলে উঠলো—
—বারবার ওই আধমরা গাছটা ফিরে আসছে।
—ভাঙছে, চুরমার করে সৃষ্টি হবে। আধমরা গাছে ফুল ফুটবে। যদি—
—যদি আমরা শুধু দেখা না, পর্যবেক্ষণ করতে পারি।
—আধমরা গাছটি আসলে টাইম স্ট্যাম্প। এর বেশি কিছু নয়।
পরিসংখ্যানবিদ গলা খাঁকারি দিয়ে বলে উঠলো।
—কে বললো এর বেশি কিছু নয়? ওই আধমরা গাছটা জীবন্ত গাছের স্মৃতি নিয়ে বেঁচে আছে। ও শুধু টাইম স্ট্যাম্প! ও আস্ত একটা যন্ত্রণার কাহিনী। ও আমার কথকতা…
চোখ মুছলো যন্ত্রণা। পরিসংখ্যানবিদ তাচ্ছিল্য করে বললো, “ওভার-ইমোশনাল ইন্টারপ্রিটেশন। ওটা একটা টাইম লুপের ইঙ্গিত মাত্র।”
—তুমি সময় মাপো, আর সময় আমার মধ্যে ক্ষরিত হয়।
কে বলে উঠলো কথাটা? সবাই এদিক-ওদিক তাকাতে তাকাতে খুঁজে পেল এক বৃদ্ধাকে, যার গলার স্বর কিশোরীর মতো। ঘোমটা খোলার মতো ধীরে ধীরে সে বলে উঠলো—
—আমি স্মৃতি।
ট্রেনের আলো পরিবর্তিত হলো। কেউ কেউ দেখছে ঝাপসা, কেউ কেউ স্পষ্ট। পরিসংখ্যানবিদ বলে উঠলো—
—সাবজেক্টিভ প্রোজেকশন নাকি কালেক্টিভ হ্যালুসিনেশন!
—কোনোটাই নয়। এই গাছ হলো তোমাদের ফেলে দেওয়া দিন। যে দিন তুমি ফেলে দিয়েছো অকারণ ছোটাছুটিতে।
—ইউ মিন আনপ্রোডাক্টিভ ডে ওই গাছটা? রাবিশ!
হেসে উঠলেন পরিসংখ্যানবিদ।
—যাকে তুমি আনপ্রোডাক্টিভ বলো, সেখানেই জমে থাকে বেশি…
—কী?
যন্ত্রণা জলীয় চোখে বললো—
—না বলা কথা… না কাঁদা কান্না… না থাকা উপস্থিতি।
(ক্রমশ)
দ্বন্দ্ব-অন্তর্দ্বন্দ্ব (পর্ব ৪)



