ডিসেম্বর সিরিজ
১
ডিসেম্বর এলেই আপত্তি ওজরে
কেটে যায় গরিমসি সন্ধ্যা
মৃত নক্ষত্রের শোক জমা করে কলম,
গুঞ্জনে গুঞ্জনে হাহাকার ভরলে
কবিতা খাতা বন্ধ করে আয়েশি জানলা।
শেষ মাসে ফিরে আসে বোঝাপড়া
মুছে যাওয়া ঘাস রাখে সাবধানী পা
ছিন্নমূল সম্পর্ক ঢাকা কুয়াশা চাদরে
ভ্রমণের গল্পগুলো হারিয়ে নিঃশব্দ হয় সন্ধ্যা।
ডিসেম্বর এলেই দূরে সরে যায় ষড়রিপু
সম্মেলনে ডাকি ভাব ও সমকাল
সন্ধ্যায় মৌতাত জমলেই খর্বাকায় হয় ইচ্ছেরা।।
২
ডিসেম্বর এলেই ঝাপসা হয় দৃশ্যপট
গেরস্ত সংলাপ লেপ কম্বলে খুঁজতে থাকে ওম
আমাদের রোজনামচা জড়ো করে
উঠোন জুড়ে মেলা বসায় বাসরলতা
ফুলের সাথে ফুলের গুঞ্জনে সরে যায় পাপ
বিগত যে হাওয়ায় লেখা ছিল প্রলয়ের দলিল
সংযত ঢঙে ছুঁয়ে যায় আলতো করে
আমাদের সাংবিধানিক প্রতিশ্রুতি জোরদার হয়
প্রত্যাশায় বাড়ে লেনদেন
মিউজিক সিস্টেমে মহামৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র বাজলেই
হাতজোড় করে স্মরণ করি আরাধ্য কৃতজ্ঞতা।।
৩
ডিসেম্বর এলেই কাচে জমতে থাকে শীত
আলসেমি বিছানা শুনতে চায় সম্ভোগের গল্প
হলুদ ক্ষেতে নিরুচ্চার প্রতিশ্রুতি
কলতলায় পা ধুতে আসে চাঁদ
পায়ের গোছে খেলা করে জোছনা
মন্ত্রোচ্চারণে ভেসে বেড়ায় ইচ্ছেপূরণ
ভরে ওঠে মধ্যযাম।হাড়ি-পাতিলের সংসার আরও পরিপক্ক হতে ট্যুরপ্ল্যান করে উড়ুক্কু মন
শেষ মাসে বাতাসে উৎসব আড়ম্বর
আদরের প্লাবনে ভেসে যায় অবয়ব
আঙুলে আঙুল ছুঁয়ে থাকে অমোঘ উচ্চারণ।।
৪
ডিসেম্বর এলেই জীবন শোনাতে থাকে অন্য গল্প
পথ আদ্যপ্রান্ত থাকে মোরাম বেছানো
উঠোনে পড়ে সূর্যের অলস ছায়া
দুপুর ঘন হয়ে ঢলে পড়ে কার্ণিশে
লজ্জা জড়ানো কাঁথা খোঁজে উষ্ণতা
বিবর্ণ হয়ে ঝরে যায় হলুদ পাতা
সকাল বিকেল ছাতারের ঝগড়ায় মেতে ওঠে নগর
অত্যাশ্চর্য সুখ চুঁইয়ে নামে শব্দের গায়ে
আড়মোড়া ভেঙে জেগে ওঠে শীত।।
৫
ডিসেম্বর এলেই টের পাই হাওয়া বদল
কৃত্রিমতা গ্রাস করলেই শেষ হয়
আলো। অন্ধকারে ক্রমশঃ ভেঙে যাচ্ছে মাঝের সেতু
পালাবদলে আয়না শোকসন্তপ্ত বন্ধুর মতো কাঁদে
বিষাদ থাবা বসাচ্ছে সুখী গৃহকোণে
প্রশ্ন করি নিজেকে
যেভাবে সকলে ঘরবাঁধে সেভাবেই তো..
ঈশ্বর যেন পূনঃ বিবেচনা করেন।
৬
ডিসেম্বর এলেই উড়ুক্কু মন চায় সমুদ্রবিলাস
অথচ,একহাত অন্ধকার নিয়ে বসে থাকা।
স্টীমারের ধোঁয়া মৃত্যুর মতো ভেসে আসে।
আমাদের বিবাহ-অভিযান শেষ হলেও
কেটলি থেকে আজও কুন্ডুলি পাকায় খেউড়
কবিতা থেকে কবিতায় প্রেম লিখেছি
হাতের ওপর হাতে রেখেছি ঢেউ-আনুগত্য
একবার আকাশে চাঁদ উঠলেই উঠে যাব ।
জোছনায় কাপড় কেচে ফিরব স্রোত অভিমুখে
তারপর দুজনে মিলে বয়ে বেড়াবো সহস্র জীবন।।
৭
আমরা মিশে যাই, আরও বেশি করে
ডিসেম্বরের কাছে মজুত থাকে আসক্ত উপকরণ
জানি যেতে হবে ঘন পথ।
জঞ্জালের স্তুপ থেকে উঠে আসে নেশামুখ
হাঁড়িয়া চড়িয়ে যারা ঘিরে ধরবে বন্ধুবেশে
অরণ্যে অকালপক্ক সন্ধ্যায় শীত নামলেই
উপুড় করা চুপড়ি থেকে উঁকি দেয় চাঁদ
বাকী থাকা গল্প ঠিকই বুঝে নেবে দিকনির্দেশনা
মনে মনে আউরাই আজ বরং
হারিয়ে যাক ঘরে ফেরার চাবি।
৮
শহরে শীত এলেই সংকল্প করি
তোমাকে উপহার দেব পাখি জীবন
তারপর সারাজীবন ধরে সবুজ সংকেত
সেবার সুদূর সাইবেরিয়া থেকে পরিযায়ী এসেছিল, তারপর ফিরে যায়নি ।স্টেশনের পাশের গাছেই গড়েছিল সংসার।
জীবনের হিসেব নিকেশ, অজস্র টানাপোড়েন শেষে
বৃক্ষজীবনে ফিরতে চাই।পর্ণমোচী কিছু পাতা ঝরিয়ে ফেললে তুমি পা ছড়িয়ে বসো জোৎস্না রাতে।।
৯
একটা কষ্টের পাহাড় ভাঙতে ভাঙতে
নষ্ট হচ্ছিল জীবন ।অগৌরবময় দিনে সুজন ছিলনা
কেবল শব্দের সাথে শব্দে খেলতাম কুমিরডাঙা
এক ডিসেম্বরে শীতকাতুর মেঘ সরিয়ে
দোলমঞ্চে যখন উঁকি দিয়েছিল চাঁদ
তখনই ঘুম ভাঙ্গলো মুক্তির ইচ্ছা
অন্ধমানুষ যেভাবে চাক্ষুস করে
ঠিক সেভাবেই ছুঁয়েছিলাম প্রিয়মুখ
যেন শুকনো মাটি ভিজে যাচ্ছে শিশির সমারোহে
চাঁদ চুপিচুপি দালানে পা ছড়িয়ে বলল
এই নাও তোমার দোসর।।
১০
ডিসেম্বর এলেই মনে হয় ভেঙে দেব
ভাঙচুর করে দেব সহস্র কুটকাচালি
শীত শুধু পোড়ায়। আত্মদহন সমূহ
আকাশে করাল মেঘ কেড়ে নেয় শীতলতা
প্রবলভাবে ভেঙে দিতে চাই আচ্ছাদন
তন্মমুহুর্তে তোমার মুখে হাত রাখলে
বদলে যায় পূর্বাপর সংকল্প
মনে মনে বলি, সেভাবে নয় সবাই যেভাবে
বরং সচেতনভাবে আদরে-যত্নে ভেঙে দেব
তোমার বিগত স্তব্ধ সময়, একটা ঘরের মতো ঘরে।
১১
ডিসেম্বরে শীত পা ছড়িয়ে শুয়ে থাকে উঠোনে
নীলচে আলো পুড়িয়ে দেয় প্রতিজ্ঞামৃত্যু অতীত
শব্দেরা জোনাকি হয়ে ঘুরছে ইতিউতি
তুমি কাছে এলেই স্থবির হয় মুহুর্ত
অন্ধকার আরও ঘন হয়ে চেপে বসে
পাতায় পাতায় শুরু হয় গুঞ্জন
আমি পড়ন্ত বেলায় টের পাই মুহুর্তজাতক অস্তিত্ব।
এক জমজমাট দাম্পত্যের হদিস।
১২
ডিসেম্বর ঘনিষ্ঠ পাহাড়ের মতো আগলাতে আসে
শীতচাদর ঢেকে দেয় বিষণ্ন মেঘ
গল্পেরা আজকাল বেশ জমজমাট
আলাপে আলাপে জড়িয়ে ধরে বাসরলতা
মস্তান বাঁশি বেজে ওঠে যথাসময়ে
বিগত নিষ্ঠুরতার দরজায় আড়ালে
সাজিয়ে বসি রঙিন সংসার
পায়ের উপর পা, বুকের ভেতর বুক
এখন আমাদের সবকিছুই মানায়।।




প্রতিটি কবিতাই সার্থক কবিতা হয়ে উঠেছে। শব্দচয়ন, ভাবের বহুবিধ বিন্যাস মুগ্ধ করলো। কবির কলমকে ঈর্ষা জানাই।
খুব ভালোলাগল প্রতিটি। ডিসেম্বর যেন ছবি হয়ে, গান হশে, আলো হয়ে, প্রেম হয়ে ফুটে উঠল।