ঋজুরেখ চক্রবর্তীর কবিতা

rijurekho

নির্ঘণ্ট

রাত বাড়লে নিচে বড় রাস্তা থেকে যানবাহনের শব্দ যত কমে আসতে থাকে, তত বেশি হাসপাতালের মতো সাদা তীব্রতায় ও অনিবার্যতায় ভেসে আসতে থাকে একটা বুনো স্যানিটাইজারের ঝাঁঝালো গন্ধ। এ গন্ধ মূর্ত, না কি অবচেতনের কোনো কল্প প্রতিমা, কিংবা প্রাকৃতিক, না কি অতি প্রাকৃতিক, এসব যেমন তোমার জানা নেই, তেমনই ধ্বনি আর ঘ্রাণের মধ্যে সমানুপাতিক বা ব্যস্তানুপাতিক কোনো সম্বন্ধই আদপে থাকা কখনো সম্ভব কি না, তা তোমার ধারণার বাইরে। তবে এটুকু তুমি বুঝে গেছ—তোমার অভিজ্ঞতার এমন সব অতিব্যক্তিগত শাঁস দিয়ে তুমি ছুঁতে পারবে না কারুরই স্বাদকোরক; তোমার সব লেখা ব্যর্থ হয়ে পড়ে থাকবে বাজারের একাদিক্রমে বধ হতে থাকা নির্লিপ্ত মুরগি গুলোর অকাতর শেষ নিঃশ্বাসের মতো উষ্ণ, অথচ রক্ত সঞ্চালন বন্ধ হয়ে যেতে থাকা অঙ্গপ্রত্যঙ্গ গুলোর মতো কোনো ছটফটানি থাকবে না তাদের অক্ষরমালায়।

একে তুমি তোমার নিয়তি বলে খাটো করতে পার না ধর্মত; না ওই স্যানিটাইজারের ঘ্রাণ, না ওই অকাতর শেষ নিঃশ্বাসের ব্যর্থ উষ্ণতা, না এই গাঢ় হতে থাকা রাত, কোনোটাকেই না। তুমি মেনে নিয়েছ—তোমার সমূহ শ্বেত পরাক্রম শুধু কিছু মুগ্ধতাই ছড়াবে সেকেলে শেষযাত্রার খইয়ের মতো, কিন্তু তার থাকবে না কোনো স্মরণযোগ্যতা; সামান্য মৃদুমন্দ বাতাসেই তা উড়ে যাবে এক স্টপ থেকে আরেক স্টপ, এক জেব্রা ক্রসিং থেকে অন্য জেব্রা ক্রসিং, এক ট্র্যাফিক সিগনালের অ্যাম্বার সতর্কতা থেকে পরের ট্র্যাফিক সিগনালের রক্তচক্ষুর দিকে, তারপর হুহু করে কোথায় হারিয়ে যাবে হরিৎ সম্মতিতে।

এই যে মেনে নেওয়া তোমার, এই যে তোমার অ্যানিমিক মেগালোম্যানিয়া জুড়ে ছেয়ে থাকা মেলাংকলিক পিছুটান, আর এই যে তোমার আকুল ব্রহ্ম জিজ্ঞাসার পরতে পরতে মিশে থাকা পরম পাপের অস্মিতা, এই মহতী বুননকে তুমি মানিয়ে নিতে পারবে ঠিক কোন রঙ ও রেখার জাদু-সমন্বয়ের সঙ্গে, তা তোমাকেই স্থির করতে হবে। আর তা ঠিক কখন শুরু করবে তুমি, না কি আদৌ শুরু করবেই না—কখনো আরও বহু অবশ্যকর্তব্যের অসম্পাদনের মতো, তাও তোমারই নির্ধারণের অপেক্ষায় মুখ চেয়ে থাকবে আরও একটা রাত ঘন হওয়া অবধি, যখন নিচে বড় রাস্তা থেকে যানবাহনের শব্দ ক্রমে কমে আসবে একটু একটু করে আর বুনো স্যানিটাইজারের ঝাঁঝালো গন্ধ ছড়িয়ে পড়তে থাকবে তোমার বিস্তৃত অপরিসীম ব্যর্থতার এক অভিজ্ঞান থেকে অপর অভিজ্ঞানে।

তুমি যে পাঁজিপুঁথিতে বিশ্বাস কর না, তা তো স্রেফ এই কারণেই—যাতে নিজের ধ্বংসের দিনক্ষণ নিজেই ধার্য করতে না হয় তোমাকে, তাই নয়?


1 thought on “ঋজুরেখ চক্রবর্তীর কবিতা”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top