আমাদের কথা…

amader kotha

বহুস্বর আমাদের। ভাষার লাবণ্যে আড়াল হয় ক্রূরতা। এই যে দু-চার পাতার সাহিত্য-কথা—এর উদ্দেশ্য ব্যক্ত করতে গিয়েও আমরা জটিলতায় ভুগি। আত্মবোধ না জনচেতনা? ব্যক্তিগত না যূথবদ্ধ চেতনা? চর্চায় সংস্কৃতির বুক চওড়া হয় কিন্তু চর্চা আপনার হৃদয়ে ঘর বাঁধে না। এই ঘরহীন ভাগ্যহারা অনলাইন পাতা বুভুক্ষু উন্মাদনার মতো ক্রাউডে ধাক্কা খায় আর খোঁজে কী সেই দুর্মূল্য এক্স ফ্যাক্টর যা আপনার ঘরের দরজায় ছিদ্র করে মধ্যরাত্রে, আর আপনিও স্ক্রল করতে থাকেন জীবনের জ্যামিতির ভুল খাতা। গল্প এগিয়ে আসে দিন বদলের ভূমিকা নিয়ে। আমরা গলা তুলে বলি দিনের বদল চাই। রঙের বদল চাই। মানুষের মুখ দেখতে চাই। চাই গোলাপি হৃদয়, মায়াবী রক্ত সঞ্চালন, থালায় চাই বেড়ে দেওয়া গরম ভাতের শুভ্রতা আর বটবৃক্ষের মতো নিরাপদ এক রাষ্ট্র চাই যে আমাদের বৃষ্টি-বাদলের সংঘাত থেকে আড়াল দেবে, রোজগার দেবে, যোজনা আনবে আমাদের সামগ্রিক উন্নয়নের। সামগ্রিক উন্নয়ন প্রসঙ্গ আসতেই মনে হল সামগ্রিক বলতে ঠিক কতখানি সমগ্রকে ধারণ করতে পারি আমরা? সাম্যের কথা প্রায়ই বলি আমরা। আমরা বলি সম্পদের সমবন্টন হোক। এই পর্যন্ত বলেই আবার মনে হল, আমরা এও বলি যে সাম্য এবং সমবন্টন একটি ভাবনা প্রসূত দৃষ্টিভঙ্গি যা আসলে আমাদের চোখ এবং মনের ভাবনাকে স্বচ্ছ করে মাত্র। কারণ সাম্য এবং সমবন্টন সত্য বলে প্রতীয়মান একটি মিথ্যা প্রক্রিয়া। অতএব আমরা প্রতিমুহূর্তে যা গড়ে তুলি পরমুহূর্তে তাকে ভাঙি। ভেঙে বলি ভাঙা-গড়াই জীবনের একমাত্র স্টেডি নির্দেশনা। এই নির্মাণ এবং বিনির্মাণের ভ্রান্তিবিলাসে মধু দেয় প্রযুক্তি। আমরা প্ল্যাটফর্ম বদল করি। সূক্ষ্ম চোখে দেখে নিই আপনার থলিতে কী আছে। মাসের শেষে কী নিয়ে ফেরেন। পার্কে কোন বেঞ্চিতে বসেন। কোন ব্র্যান্ডের পোশাক পরেন আর কোন মাপের ফ্রেমে প্রেমিকার চোখে চোখ রাখেন। আমরা গুগলিং থেকে জাগলিং করতে করতে আপনার হৃদয়ে বসত করি। পৃথিবী বেমক্কা ঘুরতে থাকে। আমেরিকা তেলের পিছনে ছোটে। ধর্ম নিয়ে সংঘাত করতে করতে রাজনৈতিক দলের মুখপাত্রেরা ডেটাবেস চেক করে। আমরা একটু আড়াল করে টেরিয়ে রাজনীতিটাকে গুলতি মারি। পাখির চোখে তীর বিঁধবে কিন্তু কে অর্জুন তা জানবে না সমগ্র মহাভারত। এই পর্যন্ত এসেই মনে পড়ে যায় জিওপলিটিক্স কথাটা আজকাল ঘরে ঘরে। ইউটিউবে হিউজ সার্চ। সবাই এখন জিওপলিটিক্স বুঝতে চাইছে। ওতে নাকি রিচ বাড়বে। এমনকি পররাষ্ট্রনীতিও অল টাইম ক্রাউড ক্যাচার! তাই বলে নিতান্ত সহজ নিয়মিত ওয়েব সিরিজের বাজার মন্দা বলে ভাববেন না। এর মধ্যেই ‘সবিতা ভাবি কী আচার’ মোস্ট সার্চড লিস্টের উপরে থাকতেই পারে। এর মধ্যেই রান টাইম এরর ঘটিয়ে সাদামাটা ভ্রমণও ঘরে ঢুকে পড়তে পারে। পৃথিবী বেমক্কা ঘুরলে কি আপনি পুরী ভ্রমণ করবেন না? মানত করা ছিল তো। দেশে দেশে খণ্ডযুদ্ধ বাধলে কি আপনি ছোটবেলার গ্রামের কথা ভেবে নস্টালজিক হবেন না? স্মৃতিকথা লিখবেন না? অবশ্যই লিখবেন। আর আমরাও সেইসব লেখাপত্তর নিয়ে হৈচৈ করে পাড়া মাতানোর চেষ্টা করে যাব।

এত কথার শেষে তাহলে কোন কথায় পৌঁছলাম?

পৌঁছলাম নিজেদের অনর্থক অভ্যাসের চর্চায়। কারণ আমরা এই মুহূর্তে একটি অশান্ত অবস্থা। পৃথিবীজুড়ে যে অস্থিরতা তার মধ্যে কোনো একটি নির্দিষ্ট অবস্থান স্পষ্ট করা বড় কঠিন। আমরা র‍্যানডম। কম্পাসের কাঁটা অনুসরণ করছি মাত্র। এ ছাড়া আমাদের অস্তিত্বের নির্দিষ্ট কোনো ব্যাখ্যা নেই। আমরা ততটুকুই যতটুকু আপনি এবং আপনারা। আমরা অতটুকুই যতটুকু আপনার সংশয়, বোধ, ভাবনা এবং ভালোবাসা। সর্বোপরি প্রেম এবং উদার চেতনা। আসুন এই আবর্তে ঘর বাঁধি একযোগে, বৃষ্টি-বাদলে এবং ঘটনা-দুর্ঘটনায়…


6 thoughts on “আমাদের কথা…”

  1. এমন বাংলা গদ্য পড়ে যে তৃপ্তি, তার কাছে আর সবকিছু তুচ্ছ হয়ে যায়। খাতায়কলমে পৃথিবীর গরিষ্ঠ-বাচ্য ভাষার তালিকায় বাংলা যত ওপরের দিকেই থাকুক না কেন, বাস্তবচিত্র তো ঠিক তার উল্টো। ১৯৯৪ সালে রাঁচি থেকে নেতারহাটগামী ভিড় বাসে একজন বিহারী ভদ্রলোক উঠে তাঁর ভারী স্যুটকেসটা দ্বিধাহীনভাবে একজন বাঙালী যুবকের পায়ের ওপর রেখে দিলেন। সেটি সরানোর কথা বলতে উত্তর মিলেছিল – “আপ প্যায়ের হটাইয়ে।” ২০২৫-এ সেই বাঙালী যুবক বেশীদূর নয়, বাউরিয়া স্টেশনের টিকিট কাউন্টারে দাঁড়িয়েও বাঙালী হওয়ার অপরাধে দোষী স্যব্যস্ত হল। একত্রিশ বছর এগিয়ে এসে বাংলা, বাঙালী যখন ক্রমশঃ, ক্রমাগত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে ভারতবর্ষের মূলসুর থেকে, জাতি যখন ভুলে যেতে চাইছে দেশের জাতীয় সঙ্গীত একজন বাঙালী কবির লিখিত ও সুরারোপিত, এছাড়াও বাঙালী এদেশকে উপহার দিয়েছে একজন বাঙালী রাষ্ট্রপতি, জাতীয় ক্রিকেট দলের অধিনায়ক, একজন অস্কারজয়ী চলচ্চিত্র পরিচালক এবং আরও অজস্র গুণী মানুষদের…তখন এই স্তরের বাংলা ভাষা আমাদের গর্বিত করে। ভাষা নিয়ে গর্ব করা সাজে বাঙালীর, ভাষার ওমে শৈত্য দূর করার মুদ্রা জানে বাঙালী…এই অনুভূতিদের আগলে রাখার সুখ আমাদের সমৃদ্ধ করে রাখুক।

    বড় ভালোলাগল।

  2. নিবিড় সাহা

    সুন্দর প্রয়াস। এভাবেই আবর্তিত হোক বাংলা ভাষা ও সাহিত্য চর্চা। আন্তরিক শুভকামনা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top