যাত্রা শুরু
মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মানো আমার মতো এক ঘরকুনো বাঙালির বিদেশ ভ্রমণ স্বপ্নের মাটিতে অবতরণ ছাড়া আর কিছু নয়। এর আগে একবার দল বেঁধে, মানে ট্যুর অপারেটরের সাথে থাইল্যান্ডের পাটায়া, ফুকে(ট) এবং ব্যাঙ্কক ঘুরে এসেছি। প্রথমবার সেই বিদেশ ভ্রমণের আগে বি – দেশটার সম্বন্ধে কিছুই জানতাম না। মনে ভরসা ছিল, ট্যুর অপারেটর যখন আছেন, তখন চিন্তা করার কিছু নেই। সেই অর্থে এবারের বিদেশযাত্রা অন্ধের হস্তী দর্শনের মতো নয়। মানে, দেশটা সম্বন্ধে এক ফোঁটাও আইডিয়া নেই, কিছু জানি না অথচ ঘুরতে চলে গেলাম। তা মোটেও নয়। যাওয়ার মাসখানেক আগে থেকেই ডেনপাসার, উবুদ, কীন্তামণি, কুটা, নুসাপেনিডা, ব্রোকেন বিচ, ডায়মণ্ড বিচ, আতু বিচ, এঞ্জেলস্ বিলাবং ইত্যাদি ইত্যাদি এত শুনেছিলাম যে মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল। ভাবছেন, কার কাছে শুনেছিলাম? আমাদের কন্যা এবং পারিবারিক ট্যুর অপারেটার পৃথা চক্রবর্তীর কাছে শুনেছিলাম। যে কোনো জায়গায় যাওয়ার আগে সেই জায়গার ইতিহাস, ভূগোল, জ্যামিতি, ত্রিকোণামিতি সব ঠোঁটস্থ করে নেওয়া ওর অভ্যেস। ও হ্যাঁ, আরো একটা অভ্যেস আছে। যা নিজে জানবে তা বাবা মাকে বলে বলে কান ঝালাপালা করে দেবে। আমাদের করার কিছু থাকে না। শুনতেই হয়। ঐ যে বলে, সন্তানের চেয়ে বড় বন্ধু আর কেউ হয় না!
তো, এবারের ইন্দোনেশিয়া যাওয়ার প্ল্যানটাও ওর। বালির সমুদ্রের রং নাকি অপূর্ব! বালির বিচগুলো নাকি স্বর্গের সমতুল। সুতরাং বেরিয়ে পড়ার তোড়জোড় শুরু হয়ে গেল। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, মেয়ে (পৃথা) যখন বলল যে আমরা ৮০ লক্ষ ইন্দোনেশিয়ান রুপি সঙ্গে নিয়ে যাব, তখন মাথা ঘুরে পড়ে যাওয়ার মতো অবস্থা। আমার অবস্থা দেখে মেয়ে সান্ত্বনা দিল। আমাদের এক টাকা মানে ওখানকার প্রায় ২০০ টাকা। অর্থাৎ আমাদের হিসাবে চল্লিশ হাজার টাকার মতো। বুকের ধড়ফড়ানিটা অনেকটাই কমে গেল। মেয়েই ওখানকার বিভিন্ন জায়গায় হোটেল বুক করল। গাড়ি, বোট সব বুক হয়ে গেল ঘরে বসেই। আমি ভাবছিলাম, কী আজব জগতে বাস করছি। ঘরে বসে হাজার হাজার মাইল দূরের দেশের সাথে যোগাযোগ চলছে শুধু তরঙ্গের মাধ্যমে। তবে আর দেরি কিসের? বাক্স, প্যাঁটরা গোছানো শুরু হয়ে গেল।
আমাদের কলকাতা থেকে ভায়া দিল্লি, ডেনপাসার (বালি) এর টিকিট ছিল। কিন্তু কপালের গুণে সেই টিকিট ক্যানসেল করে ভায়া ব্যাঙ্গালোর টিকিট নেওয়া হলো। তার জন্য অবশ্যই বেশ অর্থদণ্ড দিতে হলো। তার পরিমাণটা না হয় নাই বললাম। সেধে কেউ নিজেদের দোষ ঢাক পিটিয়ে বলে? অবশ্য তাতে প্রায় ঘণ্টা দুয়েক জার্ণি টাইম কম লাগল। মোট সাড়ে আট ঘণ্টা মতো সময় লাগে ব্যাঙ্গালোর হয়ে যেতে। দিল্লি হয়ে গেলে সাড়ে দশ ঘণ্টা! ভাবা যায়, কলকাতা থেকে দিল্লি গিয়ে আবার দিল্লি থেকে সেই কলকাতার ওপর দিয়েই উড়ে যেতে হবে! আমরা কলকাতা এয়ারপোর্ট নিয়ে গর্ব করতেই পারি, কিন্তু বিদেশে যাওয়ার জন্য বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কলকাতা থেকে কোনো ডায়রেক্ট ফ্লাইট নেই। ইনফ্রাস্ট্রাকচার নাকি যথেষ্ট নয়। অগত্যা, দিল্লি কিম্বা ব্যাঙ্গালোর কিম্বা…। কলকাতা থেকে ডায়রেক্ট ফ্লাইট থাকলে ছয় থেকে সাড়ে ছ’ ঘণ্টায় বালি পৌঁছে যাওয়া যেত। খরচও কম হতো। অবশ্য ভাগ্যিস, ব্যাঙ্গালোর হয়ে গেলাম, নাহলে এত সুন্দর এয়ারপোর্টটা দেখাই হতো না। যে দিকে দৃষ্টি যাবে শুধু দৃষ্টিনন্দন শিল্পকলা। ওদিকে ডেনপাসার এয়ারপোর্টটা যেন একটা ল্যান্ডস্কেপ। সমুদ্রের ওপর দিয়ে উড়ে এসেই প্লেনটা ঝুপ করে রানওয়েতে নেমে পড়ে। একদম সমুদ্রের পার থেকেই শুরু রানওয়ে। মনে হচ্ছিল সমুদ্রের ভেতর থেকে যেন রানওয়েটা উঠে এসেছে। অপূর্ব বললেও খুব কম বলা হবে।
বালিতে পদার্পন

ডেনপাসার এয়ারপোর্টটাও একদম ছবির মতো। আমাদের ফ্লাইট বেশ সমুদ্রের ওপর দিয়ে উড়ছিল। হঠাৎই সমুদ্র যেই শেষ হলো ঝুপ করে রানওয়েতে নেমে পড়ল। নামার আগে ডান দিকে চোখ পড়তে দেখলাম, একটা বিশাল স্ট্যাচু। পাইলট জানিয়েছিল ওটা “গড়ুর বিষ্ণু” স্ট্যাচু। এত বড় স্ট্যাচু যে বালির প্রায় সব জায়গা থেকেই দেখা যায়। যাই হোক, আমাদের প্ল্যান ছিল, বালি পৌঁছে এয়ারপোর্টেই ফ্রেশ হয়ে চলে যাব উবুদ বলে একটা জায়গাতে। গাড়ি বুক করাই ছিল। এয়ারপোর্টেই সামান্য সময় নিয়ে ফ্রেশ হওয়ার চেষ্টা হলো। ব্যাঙ্গালোর থেকে সাড়ে ছ’ ঘণ্টার রাতের জার্ণিতে ঘুম তেমন হয়নি। সুতরাং কতটা ফ্রেশ হওয়া গেল, তা সহজেই অনুমেয়।
ওখানকার সময় সকাল এগারটা (মানে, ভারতীয় সময় সকাল সাড়ে আটটা) নাগাদ এয়ারপোর্টের বাইরে এসে আমাদের বালির সারথিকে খুঁজে বের করতে একদমই বেগ পেতে হলো না। প্ল্যাকার্ড হাতে সে দাঁড়িয়ে ছিল। আমাদের দেখা পেতেই দু হাত জোর করে মাথা ঝুঁকিয়ে নমস্কার জানাল। সাথে একমুখ মিষ্টি হাসি। এটাই এখানকার দস্তুর। আমাদের গাড়িতে উঠিয়ে প্রথমেই জানাল, সে ইংরাজি খুব ভাল জানে না। কাজ চলা ইংরাজি জানে। আমরা জানলাম, তার নাম আদি প্রণোতা। সত্যিই আদির ইংরাজি কান লম্বা করে না শুনলে বোঝা খুব মুশকিল। ওর উচ্চারণভঙ্গীটাও আলাদা। যাই হোক, অনেকক্ষণ পেটে কিছু দেওয়া হয়নি। অতএব, সবার আগে আদি আমাদের একটা ভারতীয় রেস্তোরাঁতে নিয়ে গেল। একটা বিষয় ওখানে লক্ষ্য করেছি। ওরা কেউ “রেস্টুরেন্ট” উচ্চারণ করে না। “রেস্তোরাঁ” বলে।
ভারতীয় রেস্তোরাঁতে গিয়ে দাম শুনে হৃদয় বিদীর্ণ হওয়ার মতো অবস্থা। একটা শুধুমাত্র আলুগর্ভস্থ ধোসার দাম এক লাখ চল্লিশ হাজার ইন্দোনেশিয়ান রুপি। মানে, ভারতীয় মুদ্রায় সাত শ’ টাকা। কোনো রকমে তিন জনে তিনটে ধোসা গিলে উঠে চলে এলাম। জল খাওয়ারও সাহস হলো না। কারণ, চারশ’ এমএল এক বোতল জলের দাম ভারতীয় মুদ্রায় আড়াইশ’ টাকা। আদিকে জানিয়ে দেওয়া হলো, এরপর থেকে আমরা ভারতীয় মুদ্রা বাঁচাতে ভারতীয় খাদ্যগ্রহণ থেকে বিরত থাকব।
উবুদের “হোটেল এভিটেল” এ মালপত্র রেখে স্নান সেরে আমরা চরৈবতি শুরু করলাম। উবুদ আর্ট মার্কেট আর উবুদ প্যালেস একই এরিয়াতে। ওখানেই গেলাম। উবুদ প্যালেসটা বেশ পুরনো আমলের স্থাপত্যকীর্তি বহন করে চলেছে এখনও। আশ্চর্যের বিষয় এখনও সেখানে রাজ পরিবারের লোকজন বসবাস করে। বসবাসের জায়গার দিকে বাইরের লোকজনের যাওয়া বারণ থাকলেও তাঁদের তো ওখান থেকে মাঝে মধ্যে বেরিয়ে আসতেই হয়! আমরা থাকাকালীনই একজন বেরিয়ে এলেন। কী বিনম্র তার আচরণ! এই ব্যাপারে কিন্তু বালির লোকজন আমাদের থেকে সহস্র যোজন এগিয়ে। উবুদ মর্কেটে উপুড়ঝুপুর দরদাম করতে হয়। আদি বলে দিয়েছিল, দোকানদার যা দাম বলবে তার অর্ধেকেরও কম থেকে শুরু করতে। আমাদের হৃদয়ে অত বল ছিল না।

আচ্ছা, যে জিনিসের দাম বলছে চার লাখ টাকা, সেটার দাম দু লাখ হবে কী না, বলা যায়? তবে, একটা বিষয় বলতেই হয়। দরদামে না পোষালে খরিদ্দার দোকান থেকে চলে গেলেও আমাদের এখানকার অনেক দোকানদারের মতো বালির বিক্রেতারা চার অক্ষরের অপশব্দ নিক্ষেপ করে না। অসীম ধৈর্য এবং অধ্যাবসায় নিয়ে তারা পরবর্তী খদ্দেরের জন্য অপেক্ষা করে।
উবুদ সুইং
উবুদে বেড়াতে যাওয়া হবে অথচ উবুদ সুয়িং পরখ করা হবে না, তাই কী হয়? আর্ট মার্কেটে দরদস্তুর করতে করতেই ঠিক হয়ে গেল, আগামীকাল উবুদের দোলনায় দুলে আমরা কীন্তামণি চলে যাব। তা না হয় হলো,
ঘোরাঘুরি করে ততক্ষণে পেট খালি। অতএব কিছু খেতে হবে। আদিকে বললাম, আমরা বালির খাবার খাব। ও বলল বালিনিজ ফুডের মধ্যে “নাসি গোরেং” এবং “মি গোরেং” ভাল। পেটেও নাকি থাকবে অনেকক্ষণ। জানলাম, নাসি শব্দের অর্থ হলো ভাত, আর মি মানে নুডুলস্। গোরেং শব্দের অর্থ ফ্রায়েড। এবারে খাবারগুলোর মানে বুঝতে অসুবিধা হলো না। একটা বালিনিজ রেস্তোরাঁতে ঢুকে নাসি গোরেং এবং মি গোরেং এর অর্ডার দেওয়া হলো এবং তা গলাধঃকরণ করে বোঝা গেল, সত্যিই খাবারগুলো খুবই সুস্বাদু। দাম সেই ইন্ডিয়ান রেস্তোরাঁর থেকে অনেক কম। দুটোই পঞ্চাশ হাজার পার প্লেট। রাতে হোটেলে ফিরে আর কিছু খাওয়ার প্রয়োজনই হলো না।
পরদিন সকালে হোটেলে ব্রেকফাস্ট সেরে আমরা কীন্তামণির উদ্দেশে বেরিয়ে পড়লাম। মাঝে উবুদ সুইং আছে। আমরা যখন ওখানে পৌঁছুলাম তখন বেলা প্রায় দশটা (ভারতীয় সময়ে সকাল সাড়ে সাতটা)। তখনই বেশ ভিড়। আমরা টিকিট নিয়ে লাইনে দাঁড়ালাম। প্রথম দোলনাটায় দুজন করে বসতে হয়। মোটামুটি উঁচুই বটে! প্রথমে ওরা মা মেয়েতে বসল। দুজনের মুখ দুদিকে। ওরা হাসতে হাসতে ওদের দুলুনি কমপ্লিট করল। এবারে আমার সাথে আমার মেয়ের মায়ের দোলার পালা। কিন্তু সমস্যা ঐখানেই। আমি যেই দোলনায় চেপে নীচের খাদের দিকে তাকিয়েছি, আমার সমস্ত শরীর কাঁপতে আরম্ভ করল। মাথা বাঁই বাঁই করে ঘুরতে আরম্ভ করল। ভিক্ষেয় কাজ নেই, কুকুর সামলাও বাবা! আমি তাড়াতাড়ি দোলনা থেকে নেমে এলাম। ওরা “দোন ওরি, দোন ওরি” বললেও শুনলাম না। দোলনায় দুলতে গিয়ে বেঘোরে প্রাণ হারাব নাকি? বেঁচে থাকলে অনেক দোলনা পাব।
পর পর বেশ কয়েকটা দোলনায় দোলার পর আমরা ওখান থেকে বেরুলাম। মোট পাঁচ রকমের দোলনা ছিল ওখানে। সব কটার জন্য মোট দক্ষিণা আড়াই লাখ ইন্দোনেশিয়ান রুপি পার হেড। আর যদি পোশাক ভাড়া নেওয়া হয়, তাহলে তার জন্য আলাদা দুলাখ। বলাই বাহুল্য মেয়ের জন্য আলাদা দু লাখ লেগেছিল। ওখান থেকে বেরিয়ে কীন্তামণি যাওয়ার পথে আর একটা পার্কে গেলাম আমরা। পার্কটা অদ্ভুত। চারিদিকে বিভিন্ন অর্কিড আর মূর্তিতে ভর্তি। কয়েকটা কথা বলা খুব প্রয়োজন। বালির জল আমাদের মতো পর্যটকদের জন্য খুবই বিপজ্জনক। ঐ জল থেকেই “বালি বেলি” নামক এক ধরনের ডায়রিয়া হয়। সুতরাং, বালিতে প্রথম সেকেণ্ড থেকেই আমরা ওখানকার জল ব্যবহার করিনি। সবসময় বোতলবন্দী জল ব্যবহার করেছি। মুখ ধোয়া থেকে আরম্ভ করে সব কাজেই। আর একটা কথা, বালিতে যে দিকে তাকানো যাবে সেদিকেই অজস্র স্ট্যাচু বা মূর্তি। এবং তা বেশিরভাগই রামায়ণ, মহাভারতের বিভিন্ন চরিত্র বা ঘটনার ওপরে নির্মিত। ওখানকার গেটগুলোও অদ্ভুত। দেখলে মনে হবে, একটা চওড়া গেটকে মাঝে মাঝে লম্বালম্বি চিরে দুপাশে ঠেলে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। সে মন্দির বা বাড়ি বা পার্ক যা কিছুরই গেট হোক না কেন!
কীন্তামণি
কীন্তামণি যাওয়ার পথের পার্কটার কথা আগেও বলেছি। ওখানেও সুইং আছে, দুপাশে ঠেলে সরানো গেট আছে আর আছে ফটো তোলার জন্য অজস্র ব্যবস্থা। একটা কথা বলতেই হয়। বালিতে তথা ইন্দোনেশিয়াতে (যেটুকু দেখেছি) ফটোগ্রাফিকে আলাদা গুরুত্ব দিয়ে উপার্জনের উপায় করে তোলা হয়েছে। যেখানেই গেছি, এন্ট্রি ফি দিয়ে ঢুকলেও ফটো তোলার জন্য আলাদা ফি। ফটো তুলে দেওয়ার জন্য আলাদা লোকও আছে। কোথাও নিজের ক্যামেরা নিয়ে, কোথাও পর্যটকের মোবাইল বা ক্যামেরা নিয়ে তাঁরা যে ফটোগুলো তুলে দেন সেগুলোর মাত্রাই আলাদা। ঐ পার্কটায় ঘুরতে ঘুরতে আমাদের ট্যুর অপারেটর নির্ধারিত সময়ের থেকে বেশি সময় নিয়ে ফেলল। কত কায়দা করে যে তাকে ছবি তুলতে হলো! না না, এমন ভাবার কোনো কারণ নেই যে সে নিজে এত ছবি তুলছিল। তাকে ফটোগ্রাফার বাধ্য করলে সেই বা কী করে, বেচারি! তাকে তো পোজ দিতেই হয়! তাছাড়া, ফটো তোলানো যে তার পছন্দের বিষয়গুলোর একটা।
কীন্তামণি পৌঁছুতে সন্ধ্যে পেরিয়ে গেল। জায়গাটা বেশ নির্জন এবং নিরিবিলি। আমাদের “বাতুর ভিউ রিসর্ট” হোটেলটা একদম বাতুর আগ্নেয়গিরির গা ঘেঁষে। শুনেই ভয়ে প্রাণ শুকিয়ে গেল। মেয়েকে সে কথা বলতেই সে বলল

—বাপি, এমন ভিউ পাবে? কাল সকালে দেখবে কী সুন্দর জায়গাটা। বাতুর ভলক্যানোটা একদম হাতের নাগালে। ৯০ ডিগ্রি চোখটা ঘোরালেই কীন্তামণি লেক। তার পাশে তাকালেই পাবে সুউচ্চ আগুং ভলক্যানো।
—থাক, থাক। আর বলতে হবে না। এই টুকুতেই ভেতরে ভলক্যানো ফুটছে।
মেয়ে তো, তাই ওকে বলা গেল না, রাতেই যদি ভলক্যানো ফাটে, তাহলে ঐ লেকও তো জমে যাবে। আর আমরা সশরীরে স্বর্গলাভ করব। যাই হোক, নাসি গোরেং দিয়ে ডিনার সেরে ঘুমিয়ে পড়লাম। ও হ্যাঁ, বলা হয়নি, কীন্তামণি একটু উঁচুতে। তাই, সামান্য ঠাণ্ডা ছিল। তবে শোয়েটার পরার মতো নয়। আমরা ফুল হাতা শার্টের ওপরে পাতলা লিনেন জ্যাকেট পরে নিয়েছিলাম। বেশ একটা এনজয়েবল ঠাণ্ডা!
গতরাত্রে এখানে ভাল বৃষ্টি হয়েছিল। ইন্দোনেশিয়াতে বছরের সাত মাস বেশি বৃষ্টি হয়, বাকি পাঁচ মাস কম বৃষ্টি হয়। ওখানকার বাড়ির ছাদগুলো তাই দোচালা, চারচালা বা আটচালা ডিজাইনের। বেশিরভাগ বাড়ির ছাদে টালি লাগানো। তাতে, বাড়ি যতই দামী বা নামী হোক না কেন! সকালে ঘুম থেকে উঠে জানলার পর্দা সরাতেই চক্ষুস্থির। সবে সূর্যদেব ওঠার চেষ্টা করছেন। একরাশ মেঘ তাঁর উদয়পথে বাধা সৃষ্টি করছে। সেই সব মেঘের ফাঁকফোকর দিয়ে তিনি তাঁর ছটা নির্গত করে দিচ্ছেন। সেই ছটার কিছু এসে পড়ছে বাতুরে, কিছু লেকে। আগুংও সামান্য দৃষ্টিগোচর হয়েছে। দারুণ লাগছিল। বাতুরের গা বেয়ে যে কোনো এক সময় লাভা গড়িয়ে নেমেছিল তার ক্ষত পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। অনেকটা জায়গা কালো পাথরের মতো হয়ে আছে। মেয়ে কখন পাশে এসে দাঁড়িয়েছে, বুঝতে পারিনি। ওর কথায় ঘুরে তাকালাম
—২০০২ সালে বাতুর লাস্ট ফেটেছিল। এখন ওটা ঘুমোচ্ছে। আর একটু ডানদিকে ঘুরে তাকাও বাপি। আগুং ভলক্যানো দেখতে পাবে। ওটা ২০২১ এ লাস্ট ফেটেছিল।
আমি চুপ করে রইলাম। কথা বলে এই নীরব সৌন্দর্যের শান্তি কেউ ভঙ্গ করে নাকি? শুধু মাথা ঘুরিয়ে মেঘের মাঝখান থেকে মাথা উঁচু করে থাকা আগুঙকে দর্শন করে নিলাম। মেয়ে জানাল আমরা ওর উল্টো পিঠে যাব।
বেরিয়ে পড়তে হবে। বাক্সপ্যাঁটরা গুছিয়ে নিয়ে ব্রেকফাস্ট টেবিলে চলে এলাম। কমপ্লিমেন্টারি ব্রেকফাস্ট সব হোটেলেই। নুডুলসের “মি গোরেং” টাইপের কিছু খাবার নিলাম। ড্রাগনফলের রস আর কলা দিয়ে তৈরি করা এক ধরনের খাবারও নিলাম। অদ্ভুত খেতে। প্রচণ্ড মিষ্টি এবং অদ্ভুত রকমের সুস্বাদু। ওখানে কিন্তু ফলের প্রাচুর্যে মন ভরে যাবে। তরমুজ, আনারস, ড্রাগনফল, কলা, ডুরিয়ান (কাঁঠালের মতো দেখতে। গায়ের কাঁটাগুলো খুব বড় আর ভাঙলে তীব্র গন্ধ), সালাক বা স্নেকফ্রুট, পেঁপে প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়। আমরা তার সদ্ব্যবহারও করেছি। তবে ডুরিয়ানটা দাঁতে চিবিয়ে বা গলাধঃকরণ করে খেতে পারিনি। চক্ষু দিয়ে ভক্ষন যতটা করা যায় আর কি! কাঁঠালের থেকেও দশগুণ তীব্র গন্ধ। কিছুক্ষণ সেই গন্ধ শরীরের অন্দরে গেলে মাথা বনবন অবধারিত।
(চলবে)




ভাল ছবি ছাড়া ভ্রমণকাহিনি নুন ছাড়া তরকারির মতো। এখানে যে ক’টি নামমাত্র ছবি দেওয়া হয়েছে সেগুলোও নেট থেকে নেওয়া। এটা কাম্য নয়। লেখকের বেড়ানোর সময়ের ছবি দিলে লেখাটা আরো মনোগ্রাহী হতো।
ঝরঝরে ভাষায় গতিশীল ভ্রমনকাহিনিটি বেশ সুখপাঠ্য।