গোধূলির বিকেলকে সাক্ষী রেখে বয়ে চলেছে সেভার্ন নদী। অন্তারিওর উত্তরে এই নদী। নীলচে ঘোলাটে জল। শান্ত ঢেউ। মাথার ওপর নীল-সাদা আকাশ। বাবানের মনে হয়, আকাশের রঙ আর ধরণধারণ বোধ হয় সব জায়গায় একই। সে ওদের যাদবপুরে সুলেখায় হোক আর টরোন্টোয়— খুশিয়াল আকাশের রঙ নীল-সাদা। মনখারাপিতে গোমড়ামুখো গোপালদা। সুলেখা মোড়ে গোপালদার চা-বিস্কুট-ডিম-পাউরুটি-ঘুগনির দোকান। আগে গোপালদার মুখে রোদ ছিল। যেদিন থেকে গোপালদার বর্ষার কোপাইয়ের মতো বউ অটোওয়ালা রতনের সাথে ওরই অটোতে চেপে নিরুদ্দেশ হয়েছে, সেদিন থেকে গোপালদার মুখে মেঘেরা পাকা দালান তুলেছে। কলেজে পড়ার সময় বাবান কয়েকবার গোপালদার লিকার চা খেয়ে দেখেছিল। চায়ে কী একটা মশলা আর সাথে কয়েক ফোঁটা লেবুর রস— জাস্ট ফাটাফাটি! হৃদয়ে অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ নিয়ে বাবান এখন পরিণত। বোঝে, গোপালদার মুখে কেন রোদ ওঠে না, কেন ওখানে মেঘেদের বসতবাড়ি।
কয়েক হাজার মাইল দূরে এক নদীর পাড়ে বসে আছে বাবান, অথচ আর এক নদীর পাড়ে সম্পর্কভাঙনের সূচনা এখনও কী তাজা! গালে স্পর্শের তীব্রতায় ধুলোর আস্তরণ। কিছু বিশেষণের বিষ বোধ হয় বিষাক্ত ভুজঙ্গের হলাহল থেকেও তীব্র। একটা সময় বেশ কিছুদিন সবকিছু ধ্বংস করে দিতে ইচ্ছে হত—বুকের মধ্যে আগ্নেয়গিরির লাভা। কিন্তু সেভার্নের ঢেউয়ের মতো দুটো চোখ, পনিটেল আর শরীরে ছাতিম ফুলের গন্ধ নিয়ে কেউ মনের আয়নায় ভেসে উঠলে, বাবান হ্যামলিনের বাঁশি শুনতে পায়। টের পায় নিজের ভিতরে পাহাড়ি ঝোরার বয়ে যাওয়া, যে ঝোরার জল উপচে চলে আসে চোখের কোণে। এখনও। নিশিকুটুম্বের মতো নিঃশব্দে পাঁচিল টপকে ঢুকে পড়ে তিয়াসার টাইমলাইনের উঠোনে—নানা ভঙ্গিমার প্রোফাইল। ছুঁয়ে দেখে। ঘুরে আসে হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাপে। নিঃসঙ্গ প্রতিমার মতো পড়ে আছে তিয়াসার করা মেসেজ: “সরি! মানছি ইনস্ট্যান্ট রিঅ্যাকশনের লিমিট ক্রস করেছি। তুইও কি বাড়াবাড়ি করিসনি? সরি এগেন!” হাহ! দুটো এক হল? ও যা করেছিল, অনভিজ্ঞতা আর বোঝার ভুলে; আনাড়িপনা! দুঃখ প্রকাশের মধ্যেও দোষারোপ! এই মেসেজটা বাবানকে বিদেশে যাবার সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করেছিল। তা-নাহলে প্রেসিডেন্সিতে পিএইচডি করতে পারত। অবশ্য যাবার কয়েকদিন আগে তিয়াসার শেষ মেসেজটা বাবানকে কিছুটা আর্দ্র করেছিল: “তোর খুব জেদ হয়েছে। গান্ডু! মেজাজ দেখিয়ে যাচ্ছিস যা। আসলে ওখানে নিজে থেকে ধরা দেবার জন্য কতজন বসে থাকে, আমি কি বুঝি না? তবুও পিএইচডির জন্য অল দ্য বেস্ট”। শুভেচ্ছা জানানোর আগের সেন্টেন্সে কোবরার ছোবল। বিচ্ছেদের বেদনায় উপেক্ষা করেছে বাবান। সেদিনের ঘটনার পর থেকে বাক্যালাপ বন্ধ। সে দিব্যি নিয়মিত বাবানের আপডেট রাখে—সৌজন্য বাবানের গর্ভধারিণী। বাবান এসব জানে না।
তিয়াসা ওরফে যোজনগন্ধা এবং বাবান ওরফে আকাশনীল—ছোটবেলা থেকে একসাথে বেড়ে উঠেছে। বাবানদের একটা বাড়ি পরেই তিয়াসাদের বাড়ি। জন্মতারিখ অনুসারে বাবান এক বছর আট মাসের বড়। বন্ধুত্ব না অন্য কিছু? কেউ জানে না। ওরা নিজেরাই কি জানে? বিচ্ছেদের সময়টুকু বাদ দিলে ওরা একে অন্যকে আগলে রেখেছে—মায়া-মমতায়, কলহে, খিস্তাখিস্তিতে। কাছ ছাড়া হয়নি কখনও।
তিয়াসার জন্য একটা নদী কিনবে ভেবেছিল বাবান। তাই শুনে নির্জন প্রিন্সেপ ঘাটে গা ঘেঁষে বসা তিয়াসা বলেছিল, “ভালোবাসা পেলে মেয়েরা নিজেরাই নদী হয়ে যায়। তাঁদের কোনো নদী লাগে না, বুদ্ধু!” পড়াশোনায় মেধাবী হলেই যে মেয়েদের মন বুঝবে, তার কোনো মানে নেই। আনাড়ি ছেলে ভালোবাসার মানে শরীরী আদর বুঝল। এক নিরালা দুপুরে দুরুদুরু বুকে সেই ভালোবাসা দেবার উদ্যোগ নিয়েছিল। গালে সুনামি চড় আছড়ে পড়েছিল; সাথে কিছু মিসাইল—’ল্যাসিভিয়াস!, অসভ্য! বর্বর! ছিঃ!’ হতভম্ব বাবান দুঃখে, অপমানে চোখে জল নিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিল।
—
সামনে ক্রিসমাস। এখানে লম্বা ছুটি। কল্লোলিনী কলকাতা ডাকছে। কেমন একটা শিরশিরে অনুভূতি আর আকুলতা। বিচ্ছেদ বাবানকে শিখিয়েছে—কিছু সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। ওদিকে ফেসবুকে তিয়াসার উঠোনে যেন শিশিরভেজা শিউলি ফুটে আছে—ওদের দুজনের একসাথে তোলা কিছু সেলফি; সাথে ক্যাপশন: ‘তোকে ছাড়া ভালোলাগেনা কিছু’। বাবানের বুকের মধ্যে বাজে—”ইয়াদ পিয়া কি আয়ে”।
Footnote: Lascivious (ল্যাসিভিয়াস)— কামুক।



