ঘাসে জলে তিনজনে

কিছু বাদলে যাত্রা লেখা থাকে

সকাল থেকে হয়তো আকাশে একই বর্ষার মেঘ। তবু মনে হয়, আজকের মেঘ উড়ে দূরদেশ যাবে। বৃষ্টির জন্ম দেবে। সে বৃষ্টির দানা যখন পাতায় ঝরবে, পাতাগুলো বেঁকে-চুরে পাখি-শরীর পাবে। আর তারপর পাতায় গড়া সেই পাখির দল চুপচাপ ডালে বসে থাকবে। কিংবা উড়বে কিনা সে নিয়ে অনিশ্চিত থাকবে খানিকটা। সে তো জানে সে পাতার!

আটটা নাগাদ ঝাঁঝালো কোলগেট দিয়ে দাঁত ব্রাশ করতে করতে এতখানি ভেবে ফেলল শশাঙ্ক মাস্টার। আকাশে মেঘ ঘন হচ্ছে। ফের নাচতে নাচতে সরে যাচ্ছে চারদিকে। শশাঙ্কর দাঁত মাজা দ্রুত হল। ঝাঁটা দিয়ে রান্নাঘর ধোয়ার আওয়াজ বেরোতে লাগল দাঁত দিয়ে। বৃষ্টির আগেই পৌঁছতে হবে কৃষ্ণনগরের অমলার কাছে। তারপর ওদের বারান্দায় বসে ছড়ানো বাগানে বৃষ্টি নামা দেখবে। রামকিপটে শ্যাম দত্তের মেজো মেয়ে অমলা নিশ্চয় তিরিশ বছর আগের মতোই সস্তার চা আর সঙ্গে পুজোর নকুলদানা দেবে। শ্যাম দত্ত বাড়িতে বিস্কুট আনতেন না। রোগা বউ এবং আরও রোগা তিন মেয়েকে কখনও বিস্কুটের স্বাদ পেতে দেননি শ্যাম। সে সব দিনে শ্যাম দত্ত পাড়ার সবাইকে বলে বেড়াতেন, মেয়ে তিনটে তাঁর জন্মেইছে ফালতুমালতু! ফালতুদের ফালতু বায়না মিটিয়ে কোন কম্ম হবে! বাড়ির মধ্যে একমাত্র অমলা ফোঁস করত। পাশের বাড়ির বীনাদির পিঙ্ক লিপস্টিক ঠোঁটে মেখে চটি চটপটাতে চটপটাতে বেরিয়ে যেত শশাঙ্ক অথবা শশাঙ্কর যে-কোনো একজন ভালো চেহারার বন্ধুর কাছে। পরেরদিন বীনাদি লিপস্টিকের থুতু ধুতেন টিউবকলে। অনেককটা দিন পেরিয়ে শশাঙ্ক জানতে পেরেছিল, ছেলেবন্ধু পছন্দের ব্যাপারে শুধুমাত্র পেশীওয়ালা হাত-পা কিংবা বৃষস্কন্ধ অমলার শর্ত ছিল না। এক সন্ধ্যেয় দেখেছিল কৃষ্ণনগরের মূল চার্চের আঁধার বাগানে সুহাসের হাতে অমলা—!

সুহাস তখন বাপের প্রমোটরি বিজনেসে রাইজিং স্টার। বড়োভাই মতীন্দ্র পরীক্ষায় ফার্স্ট হয়ে অলস কুমীর। বাপের কারবার ফেলে স্কুল মাস্টারিতে ঢুকেছে সে। অমলা তখন মতীন্দ্রর ছাত্রী হয়ে সুহাসের কাছে পৌঁছবার শর্টকাট ধরল। অমলার অঙ্ক সুপার পারফেক্ট। ফি-রাত বিনে পয়সার নোট নিতে গিয়ে শশাঙ্ক দেখত, ইকোনোমিক্সের খাতায় মতীন্দ্রের আঙুল অমলার কাছাকাছি হচ্ছে। অমলার চোখ পর্দা টপকে যেতে চাইছে। সুহাস এইমাত্র যেখানে বাটার তিনহাজারি জুতো খুলেছে। দরজার কাছে নোটখাতা হাতে শশাঙ্ক। মতীন্দ্র বিরক্ত হত শশাঙ্ককে দেখে। ভুরু কুঁচকে বলত, “অমুর মাথা পাকা খুব। কিন্তু বড্ড চঞ্চল তো। আলাদা সময়ে আয় শশাঙ্ক।”

চার্চের বাগানে ঢুকে যে কোনো একটা কবরের ওপর দুম করে বসে পড়ত শশাঙ্ক। কুড়ি মিনিটের মধ্যে চিপস-বাদাম নিয়ে অমলা।

“হাঁদু, খা! বাদামগুলো আগে মার। গরম আছে!”

কুঁইকুঁই করত, “অমল, মতিদা তোর হাত নিয়ে…!”

কবরের ওপর গড়াগড়ি খেত অমলা।

“হাত নিয়ে কী…? বলো… কী করছে হাত নিয়ে?”

অমলা হেসেই যেত!

ঘাম দিত শশাঙ্কের গায়ে।

“ছাড় অমলা! আচ্ছা বাবা, ঠিক আছে। ওসব কথা আর তুলব না…!”

থুতুতে জড়িয়ে যেত অমলার গলা।

“খারাপ কথা বলতে তোর ভালো কেন লাগে না রে শশ? একবার বলে দ্যাখ না! হেবি সুখ হবে!”

মাটির তলায় চিৎ হয়ে অষ্টাদশের স্টিফেন জর্জ বাদামের খোলা ভাঙার শব্দ শুনত!

“দাদা, ভাত-আলুচোখা আর ডাল! হবে তো এতে?” থালার ওপর ভাতগুলো ছড়াতে ছড়াতে বলল পিঙ্কি। মুসুরডালের ওপর একথোক কাঁচা পেঁয়াজ দিয়েছে। মাইকেলনগরে দু-কামরার ফ্ল্যাটটি কেনার পর থেকেই পিঙ্কি শশাঙ্কের কাছে। রান্না, ঝাড়ুমারা, জাঙিয়া কাচা থেকে শশাঙ্কের গালে দু-চারটে চুমু—সব একা সামলায় পিঙ্কি। সপ্তাহে ছ-দিন তিনটে করে ব্যাচ পড়ায় শশাঙ্ক। মোট আঠারোটা। এ অঞ্চলে ইকনমিক্সের বাজার ভালো। শশাঙ্কের ফ্ল্যাট, বাস ও ট্রেন স্ট্যান্ড থেকে বেশ দূরে। মেয়েরা হাতের কাছে ইকনমিক্স পেয়ে যাওয়ায় ঝাঁপিয়ে পড়েছে। শশাঙ্ক সেকেন্ড ক্লাসের ছাত্র হলেও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাপটা কাজে দিয়েছে। যা পায়, তার থেকে গুণে গুণে পাঁচ হাজার টাকা পিঙ্কিকে দিতে পারে। যে মাসে চুমু বেশি, ছুতোনাতা করে এক্সট্রা একহাজার নেয় পিঙ্কি। আরো তিন বাড়িতে কাজ করলেও শশাঙ্ক নিশ্চিত, পিঙ্কি শর্মার মন পড়ে থাকে পালদাদার ওভেনে। অবাঙালি হলেও বাঙালি রান্না শেখার খুব ঝোঁক। শশাঙ্ক ওকে ঘি দিয়ে ডুমুরের ডালনা রান্না শিখিয়েছে। বাড়ি থেকে ডুমুর কেটে নিয়ে আসে পিঙ্কি! পিঙ্কির বর রাজীবও হাত লাগায়। যেদিনই ডুমুর হয়, রাজীবের জন্য একবাটি নিয়ে যেতে বলে শশাঙ্ক। শশাঙ্ক জানে, সে না বললেও রাজীবের কাছে একবাটি যাবে। তবুও প্রতিবার একই কথা বলে তৃপ্তি পেতে চায় শশাঙ্ক।

জামাটা ইস্ত্রি করতে গিয়ে দেরি হয়ে গেল। এই একটি কাজ নিজের হাতে করে শশাঙ্ক। ছাত্রাবস্থায় এক জামা ছ-দিন পরত। খুব শীত ছাড়া রোববার জামা ব্যবহার করেনি। অমলা পারমানেন্টলি সুহাসের কবজায় যাবার পর নতুন জামা পরার ইচ্ছেটাই চলে গেল। তখন শশাঙ্ক জমিবিভাগের চাকরিটা পেয়ে গেছে।

ভাত ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। আগেই বেশ খানিকটা আলুচোখা মেখে ফেলল ভাতে।

“পিঙ্কি, একটা জিনিস চাইব! রাগ করবি না বল।”

পিঙ্কি চোখ মটকাল।

“কবে রাগ করেছি পালদাদা!”

“বেশি করে পিঁয়াজ দিয়ে একটা ওমলেট করে দিবি প্লিজ…”

গ্যাস জ্বেলে ননস্টিক বসিয়েছে পিঙ্কি। গজগজ করছে… “তোমার ব্যাপার কিছু বুঝছি না পালদাদা। এই বললে সকালে তাড়াতাড়ি ডালভাত খেয়েই বেরিয়ে যাবে। কৃষ্ণনগর যাবে। এখন এটা দে, সেটা দে!”

দ্রুত হাতে গোলাপি সবজির ছাল ছাড়াচ্ছে!

“ডালে পিঁয়াজ, ডিমে পিঁয়াজ! এরপর গায়ে গন্ধ হলে আমায় কিন্তু পাবে না পালদাদা!”

গরম ওমলেটটা প্রায় হাতের ওপর ফেলে দিল পিঙ্কি! ভাতের দলার সঙ্গে ওমলেট টুকরো ভাঁজ করে মুখে দিল শশাঙ্ক! পিঙ্কি আবার পরতে পরতে মাখন-গোলমরিচ দিয়েছে। চিবোতে চিবোতে চোখ বুজে আসছে শশাঙ্কের। একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে পিঙ্কি।

“আজ তুমি কৃষ্ণনগরে কার কাছে যাবে পালদাদা?”

পিঙ্কি জানে, কৃষ্ণনগরে শশাঙ্কের পৈতৃক বাড়ি বিক্রি হয়ে গেছে।

“গন্ধবালার কাছে!”

ব্যাগে ছাতা ঢুকিয়ে নিয়েছে শশাঙ্ক। এবার সে দুটো থ্রি-ফোল্ড ছাতা কিনেছে।

বাজারে মাছ কেনার সময় হারুকাকার সঙ্গে দেখা হয়েছিল। বেছে বেছে পুঁইকলমি কিনছে। এ পারের লোক হয়েও চোদ্দ রকম শাক খায় হারুকাকা। সুহাস একদম দেখতে পারে না লোকটাকে। ঠাকুরদার ছোটো ভাইয়ের শেষের দিকের ছেলে হারুকাকা। সুহাসেরই বয়সী প্রায়। সুহাসকে দেখেই অযথা হট্টগোল করে উঠল। “এই সুহাস! এদিকে আয়! দ্যাখ, পদ্ম আজ ফ্রেশ কলমি এনেছে। আরে, খালি অমলার সঙ্গে বসে মাছভাজা খেলে হবে! দে পদ্ম, বাবুকেও ক-আঁটি দে। একসঙ্গে দামটা দিয়ে দে!”

এই এক কায়দা হয়েছে হারুকার। যখনই দেখা হবে, সামনে যে দোকানই পাবে, কিছু কিনে দাম দিয়ে দিতে বলবে হারুকা। দু-ছেলেই খাজা। একজন স্টেশনে রেলের জমি চুরি করে ফুলিয়ার শাড়ির দোকান দিয়েছে। প্লাস্টিকের ওপর শাড়ি বিছিয়ে তিনহাজারের ওপর পেন-থ্রু করে সতেরোশো লিখে রাখে হারুকার বড়োছেলে মিঠু। ছোটোটার চা-পানের দোকান। মেয়েটা বিয়ের পর বর নিয়ে হারুকার কাছে। জামাইটাই যা, একটু ভদ্রস্থ ভালো। মোটামুটি একটা চাকরিও করে। তবে যা পায়, হারুকার সংসারে ঢেলে মাসের শেষে গরিব হয়ে বসে থাকে।

“এই, এই সুহাস!” দৌড়ে আসছে হারুকা। এই বয়সেও গাঁট্টা শরীর একেবারে।

“চলে এলি কেন রে হুট করে? বললাম না… কথা আছে!”

“কখন বললে কথা আছে! যাগগে যা বলার বল। দেরি করতে পারব না!” রাগত গলায় বলল সুহাস।

“এত তাড়া কীসের রে! সম্পর্ক পুরোনো হলে অপেক্ষা করাতে হয়। চ, চা খাই।”

চা মানেই ছেলের দোকানের চা। আর ডবল দাম। ছেলেটা না চাইলেও হারু শয়তান ঠিক দাম বুঝে নেবে।

“আজ সময় নেই। লোক আসবে!” হারুর একটা কথা শুনবে না।

“জানি রে। তোদের বাড়ি কোন লোক আসবে! অমলা বলেছে।” কথার সঙ্গে নোংরা হাসিটা নিখুঁত মিশিয়েছে হারু।

তার মানে কাল আবার অমলার কাছে টাকা চাইতে গিয়েছিল হারুকা। নিশ্চয় টাকার সঙ্গে দুটো সন্দেশও দিয়েছে অমলা। এখনো হাসছে লোকটা— “আমি জানি রে জানি। তোর অমলার আরেক ইয়ে আসছে!”

“হ্যাঁ, এই ইয়েটাকে মারতে পারনি।” দাঁতে দাঁত চেপে বলল সুহাস।

“আমি মারলাম না, তোর দাদা আপনি মরল। মাস্টার হয়েও সে ছেলে এতো বাচ্চা হয়ে রয়েছে… আমি জানতাম! যেই না বলেছি… ওই দ্যাখ মতীন্দ্র… সুহাস আর তোর ছাত্রী চার্চের বাগানে জড়াজড়ি করছে…”

“অমনি রাত পার না হতে, গলায় দড়ির দাগ ফেলে দিল!” শান্ত গলায় সমবয়সী কাকার অসম্পূর্ণ বাক্য শেষ করল সুহাস।

“ও, আচ্ছা এখন আমার দোষ! দাদা পরীক্ষার খাতা নিয়ে বসেছে দেখেই তোরা শালা গিয়েছিলি বাগানে। বুকে হাত রেখে বল! তোরা জানতিস না? মতি খাতা দেখতে বসে মশা মারতে ভুলে যায়! তলে তলে তোরা বিয়ে করবি ঠিক করে নিলি! বোকা দাদাকে জানালি না! হঠাৎ করে খবরটা শুনেই না…! এই সুহাস…! কথাটা তুললি যখন, পুরো শুনে যা। আমার কাছে তোদের গার্ডেন কেলো শুনে মতি কী বলেছিল সেটা শুনে যা…!”

একটানা বকে হরি দেখল, সুহাস রাস্তার শেষ বাঁকে! ব্যাটা বুড়ো হয়ে গেছে। দু-কেজির কাতল বইতে কাত হয়ে যাচ্ছে!

চমৎকার হয়েছিল দইমাছটা। একগাদা ভাত খেয়ে ফেলেছিল শশাঙ্ক। ট্রেনে ভিড় ছিল খুব। বাড়ি বসে কাজ! অনেকদিন লোকাল ট্রেনে চড়া হয়নি। কামরাভরতি ছেঁড়া পাউরুটি, বাদামের খোসা, বাচ্চাদের হিসু গড়াচ্ছে। অমলা যদিও চান করতে বলেছিল। শশাঙ্ক করেনি। শার্টটা খাটের ছত্রির ওপর মেলে দিয়েছিল অমলা। খাওয়ার পর ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা লাগছিল। সামনেই বোসেদের পুকুর। জলাঘাসে ভর্তি পুকুরের পার। এ বাড়িটা ছেলেবেলায় ভাঙাচোরা অবস্থায় দেখেছে। সুহাসদের পৈতৃক সম্পত্তির অংশ এটা। পুরোনো বাড়িটা চমৎকার করে সাজিয়ে নিয়েছে সুহাস। দেওয়ালের রঙের সঙ্গে ম্যাচ করে জানলার রং। দোতলায় ন্যাড়া ছাদ ছিল একটা। অদ্ভুত ছাদ। একটা ছোট্ট অর্ধবৃত্ত। তিনদিক ফাঁকা। একদিকে সিঁড়ির ঘরের দেওয়াল। দরজা বন্ধ করলে নিশ্চিন্তি। পাড়ার ছেলেরা লুকিয়ে পর্নো পড়ত। চোদ্দ-পনেরোতে এ ছাদে প্রথম কলাবতীর কলা পড়েছিল সুহাস-শশাঙ্ক। সুহাসই কাকে দিয়ে যেন আনিয়েছিল বইটা। সুহাস মাঝে-সাঝে পড়লেও শশাঙ্কর প্রায় নিয়মিত পর্নো পড়ার নেশা হয়ে গিয়েছিল। অমলাকে পড়ানো শেষ করে মতিদা খুঁজে বেড়াত শশাঙ্ককে। একদিন ছাদে দেখতে পেয়ে কী ভয় পেয়ে গিয়েছিল! বাবা রে! নীচ দিয়ে চিল চিৎকার দিচ্ছে!

“শশ! শিগগির নেমে আয়। ছাদ ন্যাড়া। ছাদ পড়ার জায়গা? পড়ে গেলে মরে যাবি! ওরে নেমে আয়!”

খারাপ বই গুটোতে সময় নিয়েছিল শশাঙ্ক। ততক্ষণে ওপরে উঠে এসেছিল মতিদা। হিড়হিড় করে টানতে টানতে নিয়ে গিয়েছিল শশাঙ্ককে!

সেই মতিদা গলায় দড়ি দিল ন্যাড়া ছাদে। একদিকের দেওয়ালের একটিমাত্র আংটায় ঝুলে কী করে অতবড় শরীরটাকে ছটফট করাল! বাজারের ওঠানামা বুঝতে বুঝতে অর্থনীতির মাস্টারের কি উচ্চতার বিশেষ জ্ঞান জন্মেছিল!

মতিদার মৃত্যুচত্বর এখন অমলার টেরেস। জবা ফুটেছে। ক-মাস বাদে সার বেঁধে ডালিয়া নাচবে।

কিন্তু সুহাস ঘাসগুলো ছাঁটে না কেন! এ অঞ্চলে চিরকালই মশার উৎপাত। বর্ষায় বাড়ে। দুপুরেই মশারি টাঙিয়ে দিয়েছে অমলা। ঝিরঝিরে বাতাস ঢুকছিল মশারির মধ্যে দিয়ে। কুচকুচ আওয়াজ আসছিল। সুপুরি কাটছিল সুহাস। তিনটে পাতায় চুন-সুপুরি সাজিয়েছে!

“তোরা খা। আমি খাব না!” জানলার দিকে ফিরে চোখ বুজেছে শশাঙ্ক!

ঠা-ঠা দুপুরে বোসকাকিদের পুকুরে সাঁতার দিচ্ছে অমলা। পারে দাঁড়িয়ে কাকুতিমিনতি করছে শশাঙ্ক।

“অমলা, উঠে আয়। আজ তো আমি নামতে পারব না। চান করেছি সকালে। এখন মাথা ভিজলে জ্বর এসে যাবে। কাল দুজনে চান করব। এখন উঠে আয়।”

অমলা টুক করে ডুব দিল। উলু-উলু-উলু! মুখের জল চারদিকে ছেটাচ্ছে। ভেজা ব্লাউজ থেকে ভারী বুক উঁকি দিচ্ছে। শশাঙ্ক তাকিয়ে আছে জেনেও ঢাকেনি।

“আমি নিজের মতো চরি রে শশ। কখনো ডাঙ্গায়, কখনো জলে, কখনো আকাশে! এই দ্যাখ… তাকা আমার দিকে…!”

আরে! চিতসাঁতার শুরু করল যে মেয়েটা! চোখ আকাশে। দুহাতে বাতাস কাটছে! আনন্দ হচ্ছে শশাঙ্কর। জলে ঝাঁপ দিতে দিতে চিল্লিয়ে উঠেছিল— “অমলা, তুই হংসী, আমি হংস। উলু থামাসনি রে!”

জড়িয়ে ধরেছে হংসী। জিভের উলু পুরে দিল হংসের মুখে!

“জলের সঙ্গে মাছেদের বিয়ে দিচ্ছিস নাকি রে অমু! উলু দিচ্ছিস! বলি, কোনটা বর কোনটা বউ, ঠিক হয়েছে কিছু?”

চমকে উঠল শশাঙ্ক। দখিন পারে সুহাস। ওরে বাবা! কী ধুকপুক ধুকপুক করছে বুকটা! ঘাসের ওপর দিয়ে হেঁটে আসছে সুহাস। লম্বা ঘাসে হারিয়ে যাচ্ছে তিনহাজারি জুতো!

“এত দামের জিনিস পায়ে দিস কী করে সুহাস?”

“তবে কি মাথায় রাখব শালা! দামিকে পায়ে রাখলে দামির কাছে দাম বাড়ে!”

বলতে বলতে জলেভেজা হংসীকে পিঠে তুলে নিয়েছে সুহাস!

“শশাঙ্ক! এই শশাঙ্ক! ওঠ! দুপুরে এত কেউ ঘুমোয়! কথাই হল না তোর সঙ্গে!”

ধড়ফড় করে উঠে পড়েছে শশাঙ্ক! মশারির মধ্যে চা নিয়ে বসে আছে সুহাস আর অমলা!

“একটু মুড়ি মেখে দেব পেঁয়াজ-লংকা দিয়ে?” অমলা জিজ্ঞেস করল।

“না গো। এখনো তোমার বরের কাতলা উঠে আসছে গলা দিয়ে! তোরা এত মশলা খাস সুহাস! দাও, একটু জোয়ান দাও। এবার উঠব!”

শার্ট পরে নিল শশাঙ্ক। চুল আঁছড়াচ্ছে। আয়নায় শশর পাশে হংসীর মুখ। ছোটো শিশিতে খানিকটা জোয়ান পকেটে ঢুকিয়ে দিল অমলা। লেবু-নুন মাখিয়ে টেরেসে শুকিয়েছে! সুহাস বলল, “হরিকাকে মনে আছে তোর? আরে, বাবার খুড়তুতো ভাই রে! আমাদের পুরোনো বাড়ির পাশে থাকত!”

শশাঙ্ক উত্তর দিল না। হরিকাকে মনে পড়েছে!

“আরে, ওই যে… দাদাকে এসে আমার আর অমুর কথা বলে দিয়েছিল যে লোকটা! আর সেদিনই ভোর রাতে…!”

বলতে বলতে চুপ করে গেল সুহাস।

অমলা অবাক হয়ে তাকিয়েছিল।

“সব মনে আছে! আর হরিকাকাকে মনে পড়ছে না তোমার শশ? ওই তো মূল কালপ্রিট!”

শশাঙ্ক ব্যাগ কাঁধে নিয়েছে। পিছনে পিছনে সুহাস-অমলা আসছে। গেট অবধি এগিয়ে দেবে। শশাঙ্ক ঘুরে দাঁড়িয়েছে…

“মনে পড়েছে তো! তবে ওই কী কালপ্রিট!”

“সন্দেহ আছে তোর! ওই তো সে সন্ধেতে বাগানে আমাদের দেখার জন্য গিয়েছিল!” সুহাস গেট খুলে দিল।

“আমিও গিয়েছিলাম।”

গেটের ফাঁকে ব্যাগটা আটকে গিয়েছিল। ছাড়াতে ছাড়াতে বলল শশাঙ্ক!

সুহাস দেখল, শশাঙ্কের মুখে বৃষ্টির গুঁড়ি!

পিঙ্কি চিকেন রুটি রেঁধে রেখে গিয়েছিল। বাটি ভর্তি ঝোলে দুটো মাংস আর তিনটে গোটা আলু।

পরদিন পিঙ্কি আসা মাত্র শশাঙ্ক জিজ্ঞেস করল, “কাল আমি একা একা বেড়াতে চলে যাওয়ায় তোর কি একটু রাগ হয়েছিল?”

সঙ্গে সঙ্গে পিঙ্কি জিজ্ঞেস করল, “কাল বাটিতে মাংস কম ছিল বলে তোমার কি খুব রাগ হয়েছিল পালদাদা? আমি আসলে ওর থেকে একটুখানি…”

“জানি।”

এখন দুজন চা খাবে। আজ একটা জিভছোলা কিনে আনতে বলবে পিঙ্কিকে।


3 thoughts on “ঘাসে জলে তিনজনে”

    1. নিখিল কুমার চক্রবর্তী

      যথারীতি সুন্দর গল্প এসেছে ময়ূরীর কলম থেকে। অন্য স্বাদের, অন্য আঙ্গিকের।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top