মেজ জ্যেঠাইমা চুপিচুপি বেদেনী বুড়ির থেকে যোগাড় করা শেকড় আর কিছু কালো কালো বড়ি দিয়ে গেল। শেকড় গুলো শরীরের ভেতরে পুঁতে দিলে আমার পাপ গলে গলে বের হয়ে আসবে। বড়ি গুলো এই পাপের আত্মা পর্যন্ত পুড়িয়ে ঝামা করে দেবে। আর কখনো সে কোন বিধবা বা কুমারীর গর্ভে অনধিকার আশ্রয় নেওয়ার সাহস করবে না । সমাজের ব্যাভিচার তো থামবে না । মানুষের কুপ্রবৃত্তি রোখা ভগবানেরও অসাধ্য।
সকাল থেকেই বাড়িতে করুন সুরে সানাই বাজছে। এ প্রজন্মের শেষ মেয়ে মালতীলতার বিয়ে হচ্ছে। পাত্রের কোন দাবি দাওয়া নেই, কেবলমাত্র পাত্রী সুন্দরী হলেই হবে। যদিও সে একটু খুঁতো … দোজবরে, বিপত্নীক। তা হোক, সোনার আংটির আবার সোজা আর বাঁকা! আইন ব্যবসায়ী ছেলের মাস গেলে রোজগারখানা তো কম নয়। আবার আগের পক্ষের বউ বড়লোক বাড়ির মেয়ে ছিল। তারও মেলা গয়না গাঁটি আছে। শহরের কেন্দ্রে নিজেদের বসত বাড়ি, অভাব তো কিছুই নেই। মেয়ে খেয়ে পড়ে সুখে থাকবে। বড় ভাইরা পৃথগন্ন এবং আলাদা থাকে, শ্বশুর তো অনেক কাল নেই, শাশুড়ী মাগীও হালে মরেছে। বাড়িতে দু দুটো কাজের মেয়ে। এবাড়িরই ছোট ছেলের একমাত্র মেয়ের দেওর। চেনা পরিবার, পাল্টি ঘর, কুলীন বংশ। আর কী চাই! এ প্রজন্মের এটাই শেষ কাজ তাই জেঠতুতো খুড়তুতো সব ভাইরা মিলে মিশে হাত খুলে খরচ করছে। লতার বিয়েতে ভারি ধুম হচ্ছে, তিন দিন ধরে পুরো গাঁয়ের লোক দুবেলা পাত পেড়ে খাবে। বাড়িতে ভিয়েন বসেছে, কলকাতার বড় মিষ্টির দোকান থেকে দক্ষ কারিগর এসেছে। কয়দিন ধরে বাড়ির মেয়েরা খেটে খেটে একসা হচ্ছে তবুও তাদের খুশি আর আনন্দের ঘাটতি নেই। কথায় কথায় হাসির হুল্লোড় উঠছে অন্দর মহলে, চলছে আদিরসাত্মক কথা আর ঠাট্টা তামাশা। সবাই দু তিন প্রস্থ শাড়ি কিনেছে, বিয়ে উপলক্ষে মেয়ের বাবাও সবাইকে নতুন পোশাক কিনে দিয়েছেন। এরই মধ্যে কে নতুন বালুচরি কিনে বাপের বাড়ির উপহার বলে চালাচ্ছে, কার ঢাকাই শাড়ি ক্যাটকেটে রঙের সেই নিয়ে চলছে তুমুল জল্পনা আর পরনিন্দা। সারা বছর দেরাজের বিশেষ খোপে লুকিয়ে থাকা ভারী ভারী অলঙ্কার নব্য তরুণীদের সৌন্দর্য্য আর অহঙ্কার দুইই বাড়িয়ে তুলছে। সবাই টাকা খরচ করে কলকাতা থেকে স্নো পাউডার আর কান্তা সেন্ট এনেছে। ছোট্ট সেন্টের শিশির সোনালী ঢাকনা খুলে উপুড় করে ধরলে সুচের মতো ছিদ্র দিয়ে দু এক ফোঁটা সুগন্ধি কাপড় ভিজিয়ে দেয়। আর সেটা যত শুকোয় তত তার সৌরভ ছড়িয়ে পড়ে।
অপেক্ষাকৃত বয়স্কারা এসব কৌতূহলী হয়ে দেখে আর ইচ্ছে চেপে মুখ বেঁকায়, তাঁদের কাপড় আলাদা অলঙ্কারও আলাদা। চওড়া লাল পেড়ে কোরা রঙের গরদ বা তসর, হাতে মোটা মোটা বালা আর চুড়ি , গলায় বিছে হার বা পাটি হার। কাঁচা পাকা চুলে বড় করে খোঁপা বেঁধে সিঁথি ভরে সিঁদুর পড়া । চিৎকার চেঁচামেচি , ছোটদের হুল্লোড়, মারামারির মধ্যেই এক সময় মেজ জ্যাঠাইমা আমাকে পাপ মুক্তির পথ দেখিয়ে গেলেন। রাতের দিকে এলে হয়তো কারোর চোখে পড়ত, এই বাস্ততায় কারোর চোখে পড়লেও ভয় নেই। যতই হোক আমি যে বরের মাসি কনের পিসি, মেজ জেঠাইমা আমার সঙ্গে আলাদাভাবে কোন কথা বলতেই পারেন।
“একটা কথা শোন বলছি মেয়ে, নিজের কালো মুখ নিয়ে আর ঘরে লুকিয়ে থেকো না, লোকের সন্দ হবে। বিয়ে বাড়িতে এত লোকজন জ্ঞাতি গুষ্টি এয়েছে। ঘর থেকে বের হও, ওদের সঙ্গে ডেকে হেঁকে কথা কও। হাসি ঠাট্টায় যোগ দাও। তবে খবরদার বলছি হাতে করে কাউকে কিছু খেতে দেবে না, ছোঁওয়া বাঁচিয়ে চল। ঠাকুর ঘর আর কোন হেঁসেলের ধারে কাছে যেন তোমায় না দেখি। এর যেন অন্যথা না হয়। নইলে কপালে দুক্কু আছে সে কথা বলে রাখলাম।”
মেজ জ্যাঠাইমার কথা গুলো কানের মধ্যে যেন জ্বলন্ত আগুন ঢেলে দিয়েছিল। এ এক অদ্ভুত পরিস্থিতি, মরলেও কলঙ্ক বাঁচলেও কলঙ্ক!
আর সে কলঙ্ক প্রকাশ হলে দুই কুলই মজবে। তাই মরা হবে না, বেঁচেই বা থাকব কিভাবে জানি না। সর্বাঙ্গে কলঙ্ক মেখে বেঁচে থাকার লাঞ্ছনা সহ্য করতে করতে শমন আসার অপেক্ষা করতে হবে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত।
ক্লান্ত বিধস্ত শরীরটা টেনে নিয়ে মেয়ে মহলের মজলিসে এনে ফেললাম। সবাই হই হই করে উঠলো, একজন প্রতিবেশিনী বলল, “এই যে উনি এয়ে পড়েছেন এতক্ষনে! ওলো সাবধানে কথা কইবি লো, সবাই চুপটি করে থাকো। আমাদের কনের শ্বশুর বাড়ির নোক এয়েচেন, খান্ডারনী সেজ জা বলে কতা! মন দিয়ে কাজ কম্ম কর সব। ইস্তিরি আচারে কোন ভুল হলে অমনি কী দোষ ধরে বসে মেয়েকে হাজার খানা কতা শোনাবে, বাপের ঘর তুলে খোঁটা দেবে!”
তার কথা শুনে সবাই সমস্বরে হেসে উঠলো। কয়েক জন বলল, “হ্যাঁ গো, ঠিকই বলেছ বটে। তবে ও বিধবা মানুষ তাই রক্ষে। ইস্তিরি আচারের সময় থাকতে পারবে না। নইলে যে কী ভয়ে ভয়ে কাজ করতে হতো!”
লতার গায়ে হলুদ হয়ে গেছে। নতুন একখানা লাল শাড়ি আর এক গা গয়না পরে চুপ করে বিছানার এক কোনে বসে আছে, সেই কোন ভোরে দধি মঙ্গলে দুটো চিঁড়ে দই মুখে দিয়েছে। মুখখানা খিদেয় শুকিয়ে এসেছে বেচারির।
একটু হেসে বললাম, “নিশ্চই তো, তোমরা সব কাজ ঠিক ঠাক করছো কিনা সেই দেখতেই তো এলাম। কোন ভুল ত্রুটি হলে হাজার খানা কথা শুনিয়ে দেবই তো!”
আবার এক চোট হাসির ফোয়ারা ছুটল।
ক্রমশ



