পোড়ামাটির গ্রাম – দ্বিতীয় পর্ব

poramatir 2nd parbo

হৈমন্তীদের কুটির থেকে পুকুরের দূরত্ব আধ কিলোমিটারের মতো। বাড়ি থেকে বেরিয়ে একটা কাঁচা মাটির রাস্তা। এই রাস্তা ধরে যেতে হৈমন্তীর খুব ভালো লাগে। তার কারণ রাস্তাটার দুপাশেই ক্ষেত। যখন ও কলসি কাঁখে এই রাস্তা দিয়ে হাঁটে, ওর মনে হয়, কেউ যেন ওকে অনুসরণ করছে। কিন্তু পিছন ফিরে দেখলে, হৈমন্তী কাউকে খুঁজে পায় না। প্রথম প্রথম হৈমন্তীর মনে ভয় ভয় করত। কিন্তু দীর্ঘ কয়েক মাস ধরে একইরকম অনুভূতি নিয়ে চলতে চলতে হৈমন্তীর আর ভয় লাগে না। বরং মনে হয়, যে দেখছে, যে অনুসরণ করছে, সে হয়তো তার রূপেই মুগ্ধ। হৈমন্তী নিজে যেমন এই দুপাশের ক্ষেতের রূপে মুগ্ধ। কেন যে এমন ভাবে তাকিয়ে থাকতে ভালো লাগে, কে জানে! ভোরের তাজা সূর্যের আলো শিশিরভেজা বাংলার ক্ষেতের উপর এসে পড়লে, সব গাছগুলি যেন কেমন ঝিকঝিকিয়ে ওঠে। তরুণীর ডবকা হয়ে ওঠার ইচ্ছের মতো, কিশোরীর প্রমত্তা হয়ে ওঠার ইচ্ছের মতো, প্রকৃতির মধ্যে এক যৌবনের ডাক। হৈমন্তীর মনে পড়ে যায়, চন্দনের কথা। কী সব যে বিড়বিড় করে ওঠে। বলে, বাংলায় লেখা পদ্য। অবশ্য সে নিজে লেখে কিনা জানা নেই। তবে সে সেদিনই এই ক্ষেতের ধারে হৈমন্তীকে মুগ্ধ হয়ে ক্ষেতের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে বলে উঠল, এক গুরুর কবিতা মনে হচ্ছে শোনাও। শুনবে?

হৈমন্তী মুগ্ধ হয়ে বলল—কার গুরু? কোন কবিতা?

–        শুনবে কি না বলো না/

–        আচ্ছা শোনাও।

কাঁখে এককলসী জল নিয়ে হৈমন্তী তখন দাঁড়িয়ে আছে বাঁশবাগানের ধারে। চন্দন শোনাতে লাগল– কহন্তি গুরু পরমার্থের বাট।

কর্ম্ম কুরঙ্গ সমাধিক পাঠ।
কমল বিকসিল কহিহ ণ জমরা।
কমল মধু পিবিবি ধোকে ন ভোমরা।


হৈমন্তী বলল—এর মানে কী? মানে বুঝিয়ে বলো।

–        কহেন গুরু পরমার্থের বাট।
কর্মের রঙ্গ সমাধির পাট।

–        কমল বিকশিত, কহিও না জোংড়াকে
কমল মধু পান করিতে ক্লান্ত হয় না ভোমরা।

হৈমন্তীর সঙ্গে চন্দনের মাঝেমাঝে দেখা হয়। আর যখনই দেখা হয়, সে এমন টুকরো টুকরো কবিতা বলে কোথায় চলে যায়। চন্দনই কি দূর থেকে দেখে হৈমন্তীকে? হতেও পারে। কারণ চন্দনের দুচোখে হৈমন্তী দেখেছে সেই মুগ্ধতা। সেই আকাঙ্খা। এই আকাঙ্খাই সে দেখেছিল, যখন সে গান গাইত গ্রামের মধ্যে পালায়। তার নিজের লেখা গান।

এখান থেকে আরও একটু দূরে গেলে লোকালয়। লোকালয় থেকেও আরও একটু দূরে চলে গেলে রাজা গণেশের নগর। পাণ্ডুয়া।

পুকুরের কাছাকাছি পৌঁছতেই পিছন থেকে একজন কেউ ডাকল হৈমন্তীকে। কে? শিবচরণ।

শিবচরণ লোকটিকে দেখলেই হৈমন্তীর মন কুঁচকে যায়।

শিবচরণ এমন এক দৃষ্টিতে হৈমন্তীর দিকে তাকিয়ে থাকে, যেন বা সে তার সারা শরীরকে তার দুচোখ দিয়ে লেহন করছে।

শিবচরণ হৈমন্তীর কাছে এসে বলল, হৈমন্তী, আমাকে একটু সময় দাও। আমাকে একটু সময় দাও।

হৈমন্তী বলল, আমি কী সময় দেব, তুমি তো অদ্ভুত নাগর।

শিবচরণ বলল, না না। আমি তোমাকে শুধু আমার শিল্প করে তুলতে চাই। একটি মন্দিরের কাজ চলছে জানোতো। আমি তোমাকে এঁকেছি। তোমার শরীর আমাকে কয়েক হাজার বছর আগের সেই নৃত্যরতা রমণীর দিকে নিয়ে যায়।

–        দেখো, আমি এসব জানি না। আমার বাবা চাষি। আমি ক্ষেতে হাত লাগাই। তুমি কী চাও?

–        আমি তোমাকে শুধু লক্ষ্যই করে যাচ্ছি। আজ আমি তোমাকে সামনে থেকে দেখব। তুমি আমার শালভঞ্জিকা।

–        কী? সে কে? তুমি আমাকে তোমার বউ করতে চাইছ নাকি? আমি তোমার বাইদ্যানি হতে পারব না।

–        না না। তোমাকে কিছু হতে হবে না। তুমি আমার শিল্প হও। তাহলেই হবে।

–        আর যদি তারপর রাজা গণেশের লোক এসে আমাকে ধরে নিয়ে যায়? শুনেছি, তিনি খুব অত্যাচারী। অনেক নারীকে নাকি তিনি ভোগ করে ছিবড়ে করে দিয়েছেন।

–        শুনেছ? ( গলা গম্ভীর হয়ে গেল শিবচরণের। ) শুনেছি মুসলমানরাও ক্ষিপ্ত হয়েছে। আবার কেউ কেউ তাকে পছন্দও করে। তবে আমরা আদার ব্যাপারী। জাহাজের খোঁজ নিয়ে কী করব? আমি তোমার বাপের সঙ্গে কথা বলব।

–        তুমি কি আমাকে দূর থেকে দেখতে?

–        হ্যাঁ তোমার প্রেমিকের মতো, আমিও তোমাকে দূর থেকে দেখতাম।

–        কে আমার প্রেমিক?

এবার সুউচ্চ কণ্ঠে হেসে উঠল শিবচরণ।

–        ঠিক আছে, তুমি নিজেই খুঁজে নিও।

এই বলে শিবচরণ সর্ষেক্ষেতের মধ্যে হারিয়ে গেল। যেখানে ধানক্ষেত শেষ, সেখানে সর্ষেক্ষেতের শুরু। হৈমন্তীর বুকের ভিতর এক অজানা ভয় উঁকি মারছে। লোকে বলে শিল্পীদের সামনে নাকি কোনও কাপড় পরে থাকা যায় না। সম্পূর্ণ নগ্ন করে দেয়। তারপর তারা দেখে দেখে কী সব ছবি আঁকে। অবশ্য এ কথাও শোনা যায়, তারা গায়ে হাত পর্যন্ত দেয় না। এই শিবচরণ লোকটা পোড়া মাটির কাজ করে। তার বাপও করে। ক্ষেতের কাজ করে বাড়ি ফিরে তার বাপ নবীন ফিরে এসেই ঢুকে পড়ে তার কারখানায়। সেখানে সে একা একা মাটির উপর আঁকিবুকি কাটে। কিছু পুঁথির মতো কাগজপত্র আছে। সেখানে সে আঁকে। মহাভারত, রামায়ণের গল্প। আবার মা দুর্গার কাহিনি। আরও কত লতাপাতা। এসবের নাম জানে না হৈমন্তী। কলসিতে জল নিয়ে হৈমন্তী ফিরে যেতে থাকল বাড়ির দিকে। চন্দন কি রাস্তায় এখনো আছে? চন্দনের জন্যই কি শিবচরণ বলল প্রেমিকের কথা? হ্যাঁ, সে তো ক্ষেতের ধারে এখনো বসে আছে ছায়ায়। আকাশের দিকে তাকিয়ে কী যেন ভাবছে। এখনো বেলা শুরু হয়নি। তাই তেমন কোনও লোকজন নেই। চন্দনের সামনে গিয়ে কোমড়ে হাত দিয়ে হৈমন্তী দাঁড়াল।

তাতে চন্দনের চটকা ভাঙল।

–        এই যে, লোকে তোমায় আমার প্রেমিক ভাবছে, তা তুমি জানো?

–        তোমার প্রেমিক? অসম্ভব। তুমি কোথায় আর আমি কোথায়?

–        তুমি কী করো?

–        আমি পদ্য ভাবি।

–        সে তো জানি। তুমি পদ্য ভাবো, গান ভাবো, গান গাও আর সারাদিন টইটই করে ঘুরে বেড়াও।

–        হ্যাঁ ঘুরে বেড়াই। আমার ঘুরে বেড়াতে ভালো লাগে। ভাবো হৈমন্তী, একদিন আমরা এই পৃথিবী থেকে সম্পূর্ণ হারিয়ে যাব। যেখানে আছি, সেই জায়গাটা যতটা পারি, দেখে যাব না?

হৈমন্তীর মুখে কোনও কথা এল না। তার মনেও একই কথা আসে। কিন্তু সে তো তেমন ভাবে কোথাও যায়নি। শুনেছে বাইরে নাকি প্রচুর যুদ্ধবিগ্রহ চলতেই থাকে। একমাত্র তাদের এই রূপসায়র গ্রামে কোনও যুদ্ধের ছায়া এসে পড়েনি।

–        তুমি যুদ্ধ দেখেছ?

–        হ্যাঁ। দেখেছি। তবে যুদ্ধের পর। যখন যুদ্ধক্ষেত্রে অসহায় রক্তাক্ত মানুষেরা পড়ে আছে মাঠে, সে সময় দেখেছি। গেছি।

–        তুমি গেছ তাদের মধ্যে?

–        হ্যাঁ, দেখেছি যারা যুদ্ধ করে, তারা যুদ্ধের পর কেমন একে অপরের পাশে বসে কাঁদছে। কারো হাত কাটা, কারো পা কাটা, কারোর শরীর থেকে গলা আলাদা হয়ে গেছে। কারো আবার গা থেকে গলগল করে রক্ত পড়ছে আর তারা মা মা বলে ডাকছে। কিন্তু কেউ এসে তাদের শুশ্রুষা করছে না। তাদের ফেলে রেখে দিয়ে গেছে মরে যাওয়ার জন্য।

–        তারপর? কী সব ভয়ংকর কথা শোনাচ্ছ?

–        হৈমন্তী, জীবনটা কি শুধুই তোমার ধান আর সর্ষের ক্ষেত? জীবনটা যুদ্ধের। মানুষ দখল করতে চায় জমি। এই সব সৈন্য, এরা কারা? এরা কেউ পশুচারক, কেউ কৃষক, কেউ কোনও বাজনদার, কেউ বা শিল্পী, কেউ বা শ্রমিক। এদেরকেই সৈন্য করা হয়। এরা একে অপরের সঙ্গে যুদ্ধ করে। কারা কাদের সঙ্গে যুদ্ধ করে? নিজেরাই নিজেদের বিপক্ষে যুদ্ধ করে। ক্ষমতায় বসে যারা, তারা তো আর যুদ্ধ করে না। যুদ্ধ করায়।

হৈমন্তী কাঁখের কলসী মাটিতে রেখে চন্দনের পাশে বসল। পিছনে সরষের ক্ষেত। আর একটু দূরে ধানের ক্ষেত। আর এই যে আলপথ, এই আলপথ ধরে একটু বাঁদিকে এগিয়ে গেলে রয়েছে পাটের ক্ষেত। এখান থেকে আরও একটু দূরে গিয়ে রয়েছে আখের ক্ষেত।

হৈমন্তী চন্দনের দিকে তাকিয়ে বলল, তুমি আমাকে আগে যে কবিতা শোনালে তিনি কে?

–        ও তিনি তো মীননাথ। বহু আগে ছিলেন। তিনি কবি। ( এই বলে সে দু হাত নিজের মাথায় ঠেকিয়ে প্রণাম করে।)

–        হ্যাঁ খুব ভালো লাগল। আমাকে আরও কিছু কবিতা শোনাবে?

–        তোমাকে দেখলেই আমার মনে হয় কদলীনগরে গিয়ে মীননাথের যা অবস্থা হয়েছিল, ঠিক সেরকম।

–        কেমন তা?

-“কহিলেন মীননাথ মনে মায়া ধরি।
জগতেও পাই যদি এমন সুন্দরী।
বিচিত্র শয্যাতে থাকি হেন নারী লই।
রঙ্গ কৌতুকরসে রজনী পোয়াই।“

–        আমাকে দেখে তোমার এমন মনে হয় বুঝি?

–        না না। আমি ত শুধু তোমাকে চাই। আর কোনও নারীকে চাই না।

–        তাহলে শিবচরণ ঠিকই বলেছিল।

–        কী বলেছে? শিবচরণ আবার কে?

–        এ কী, তুমি শিবচরণকে চেন না? ওই যে পোড়ামাটির শিল্পী?

–        ও আচ্ছা, ( এই বলে আবার সে দুহাত কপালে নিয়ে প্রণাম করে) তিনি তো বিরাট বড় শিল্পী।

–        ও মা, তুমি তাকে প্রণাম করছ। তিনি আমাকে কী বলেছেন জানো?

–        কী বলেছেন?

–        বলেছেন আমাকে কী একটা ভঞ্জিকা। তাই আমাকে তার কাছে যেতে হবে। আমাকে দেখে দেখে তিনি আঁকবেন।

–        আরে, এতো দারুণ খবর। তুমি একটা শিল্পের অংশ হয়ে উঠবে। চিরকালের মতো মন্দির বা মসজিদের গায়ে তুমিই থাকবে। ভাবো। হাজার বছর পরে যখন মানুষ এসে ভাববে এই অপরূপ মূর্তিটা কার, তারা কি আর কাউকে খুঁজে পাবে? তারা জানবে এই মূর্তি তোমার। তখন সবাই তোমার এই যৌবনের জয়গান গাইবে। ভাবো, তুমি একবার শিল্পের অংশ হয়ে উঠলে আর তোমার মৃত্যু হবে না। তুমি একটা সময় বুড়ি হয়ে যাবে। তোমার চামড়া ঝুলে যাবে। তুমি মরে যাবে একদিন। পুড়ে ভস্ম হয়ে যাবে তোমার দেহ। শুধু তুমি কেন, সকলেই। কিন্তু তুমি শিল্পের অংশ হয়ে উঠলে, তোমার এই সৌন্দর্য চিরকাল একইরকম থেকে যাবে।

–        তুমি আমার প্রেমিক হয়েও চাইবে আমি যাই?

–        হ্যাঁ চাইব। কারণ আমি তোমার সৌন্দর্যকে ভালোবাসি। আমি তোমাকে ভালোবাসি।

হৈমন্তীর সে সময় কী মনে হল, সে জানে না। সে জড়িয়ে ধরল চন্দনকে। চন্দন এই ঘটনার জন্য প্রস্তুত ছিল না। হৈমন্তীর শরীরে বসন্তকালের মতো গন্ধ। ধানক্ষেতের মধ্য দিয়ে হাঁটার সময় যে আশ্চর্য ভিজে একটা শান্তির গন্ধ থাকে, হৈমন্তীর শরীরে তেমন একটা ঘ্রাণ। এই গন্ধ মনে হয় বহুদূরে ছড়িয়ে যায়। এক অদ্ভুত যোগাযোগে তার কোঁকড়া চুলের ভিতর চন্দনার মুখ তলিয়ে গেল। কেন এমন কোঁকড়া চুল হৈমন্তীর? কেন? হৈমন্তীর মুখের দিকে তাকালেই মনে হয় চন্দনের, এক নির্জনে ফুটে থাকা ফুল। এমন এক ফুল, যার জন্য সারা পৃথিবীর সব মানুষ হন্যে হয়ে ঘুরছে। কিন্তু সেই ফুল ফুটেছে এই বাংলাদেশের এক কোণে। যেখানে নদী তিরতির করে বয়ে যায়। যেখানে ক্ষেতের পাশে আরও একটা ক্ষেতের মধ্যে অকারণে ডাকতে থাকে ঝিঁঝিঁ। আর সেই ঝিঁঝিঁর ডাক যখন শুরু হয়ে গেছে, তখন আস্তে আস্তে চন্দনের ঠোঁট মিশে গেল হৈমন্তীর ঠোঁটে। হৈমন্তী হয়তো এতটা আদরের জন্য প্রস্তুত ছিল না। দ্রুত নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বসে থাকল কিছুক্ষণ। ক্ষেতের দিকে তাকিয়ে আনমনা হয়ে গেল মন। চন্দন কী বলবে, তা বুঝতে পারছিল না।

বেশ কিছুক্ষণ পরে হৈমন্তী বলল, বাড়ি যেতে হবে। তুমি কি যাবে আমার সঙ্গে? বাড়ি অব্দি?

চন্দন বলল, চলো।

হৈমন্তীর পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে গুনগুন করে চন্দন গান গাইতে লাগল। পায়ের তলায় বেলা বাড়ার পর রোদ আর শিশির শুকিয়ে আসা মাটি। পাশে চন্দন। আর সে গান গাইছে। একটা অদ্ভুত দেশের গান। এমন গান সে কখনো শোনেনি। নিশ্চয় এ গানও তেমন কোনও পালাগান। চন্দন কত গান জানে।

চন্দন তখন নিজের মনে গেয়ে চলেছে-

একটি ফুলের লেগে এত অভিমান গো।
দুয়ারে বসিয়ে দুবো ফুলেরি বাগান গো।।
মাগো নম নম নম মাগো নমো নারায়ণী।।
কী দিয়ে পূজিব মাকে মনে ভাবি তাই গো।
স্বর্গে পূজে দেবলোক, পাতালে পূজে বলি গো।।
মাগো দুগ্ধ দিয়ে পূজবো কিগো বাছুরে আগে খায়।
পুষ্প দিয়ে পূজবো কিগো ভমরে মধু খায়।।

এক অদ্ভুত মন কেমন করা সুরে আচ্ছন্ন হয়ে গেল হৈমন্তী। ডোবাটা পেরিয়েই তাদের ক্ষেত শুরু হয়ে গেছে। এই ক্ষেতের পাশেই তাদের বাড়ি। আর বাড়ির লাগোয়া ছোটো কারখানা। ভালোবেসে  তার বাবা এই কারখানার নাম দিয়েছে পোড়ামাটির পুরী। হ্যাঁ মাটি এখানে পুড়ে যায়। আর তারপর পুড়ে যাওয়ার পরে মাটির ভিতর থেকে প্রাণ আবিষ্কার করে তার বাবা। হৈমন্তী এখনো পর্যন্ত কিছু করেনি। কিন্তু তার ছোট ভাই শান্ত পোড়ামাটির কাজ করে। পোড়ামাটির কাজ করেই তো তাদের ঘর হল,ক্ষেত হল। পোড়ামাটির কাজই তাদের লক্ষ্মী। আবার নাকি নতুন করে কাজ শুরু হবে। কারণ দেউলঘাটের মন্দিরের গায়ে বসবে শিল্প।

poramatir gram 2nd

চন্দন হৈমন্তীর দিকে তাকিয়ে রইল। কিছুই বলল না। হৈমন্তী কাঠের বেড়াটা সরিয়ে দিয়ে ভিতরে ঢুকে গেল।

চন্দন তাকিয়ে রইল হৈমন্তীর দিকে।

চন্দন বোঝাতে পারে না হৈমন্তীকে, কিছুতেই বোঝাতে পারে না, হৈমন্তীকে সে স্বপ্নে দেখে। স্বপ্নে সে অনেককিছুই দেখে। সে স্বপ্নের ভিতরে ঢুকে যেতে চায়। কিন্তু সে পারে না। কী যেন তাকে আটকে রাখে। মায়ার বন্ধনে সে জড়িয়ে আছে তার পদ্যগুলির সঙ্গে। পদ্যগুলির মায়া কাটিয়ে সে নিজের স্বপ্নের মধ্যে ঢুকে পড়তে পারে না। কারণ সে জানে, একবার স্বপ্নের বাস্তবতার মধ্যে ঢুকে পড়লে সে আর বেরোতে পারবে না। এসব কী লেখার কথা ভাবছে সে? নদীর কথা, গ্রামের কথা, এমন সব গান কি আদৌ হয়েছে, যা তার নদীর কথা বলবে, এই গ্রামের উপর রাত্রিকালীন যে নক্ষত্র নেমে আসে, নেমে আসে যে কুয়াশা, তার কথা বলবে। চন্দন কিছুতেই ভাষা খুঁজে পায় না। তার মনে হয় গ্রামের শেষ সীমান্তে সে শ্মশান, সেই শ্মশানের চাঁপালগাছ, সেই চাঁপালগাছকে নিয়ে সে কিছু গান বাঁধে। তার ইচ্ছে হয়, একটু দূরে যে পীর সাহেবের সমাধি, তাকে নিয়ে সে কিছু গান বাঁধে। সবসময়ই তার মনের ভিতরে কে যেন কাঁদে। একা, একা, অঘ্রাণের অন্ধকার মাঠের পাশ দিয়ে যেতে যেতে সে টের পায় সে কিছু বলতে চায়। বলতে চায় তার মৃত বাবার কথা। দিনের যখন আর কোনও সময় তার বাবার কথা মনে পড়ে না, তখন দিনের শেষ এবং সন্ধ্যার শুরুর এই সময়টায় সে ফিরে আসতে চায় এখানে। এই অন্ধকার আর আলোর মধ্যবর্তী একটি সময়ে। সেখানে তার বাবা আছেন কোথাও। কিন্তু কোথায় আছেন? কোথায় হারিয়ে গেলেন তিনি? শত খুঁজেও চন্দন আর গ্রামের কেউ তার বাবার কোনও সন্ধান পাননি। অথচ এখনো তাদের বাড়ির পিছনদিকে হৈমন্তীদের বাড়ির মতোই রয়ে গেছে একটি কারখানা। অনেক পোড়ামাটির টুকরো, অনেক অসমাপ্ত পোড়ামাটির শিল্প, অনেক চিত্র, অনেক খসড়া পড়ে আছে তাদের বাড়িতে। সে এই সব চিত্রের দিকে, এই সব অসমাপ্ত শিল্পের দিকে তাকিয়ে অসহায় বোধ করে। যে শিল্পের ভাষা জানে না, সে কিছুতেই শিল্প কী বলতে চাইছে, তার অর্থ উদ্ধার করতে পারবে না।

চন্দনের মনে হয়, তার বাবা হারিয়ে যায়নি। কোথাও একটা আছে।

কিন্তু চন্দন বুঝতে পারে না কোথায়। ঠিক কোথায় তার বাবা সূত্রধর পাল হারিয়ে গেলেন।

(ক্রমশ)

আগের পর্বের লিঙ্ক পোড়ামাটির গ্রাম – প্রথম পর্ব


Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top