পোড়ামাটির গ্রাম – প্রথম পর্ব

poramatir gram parbo ek

সূচনা

[পোড়ামাটির মন্দিরের গায়ে শত শত বছর ধরে স্থির হয়ে থাকা নারী, পুরুষ, দেবতা, যোদ্ধা ও অজানা শরীর। কিন্তু সত্যিই কি তারা স্থির? বাংলার শিল্পের দীর্ঘ ইতিহাসের ভিতর দিয়ে এক সময় থেকে অন্য সময়ে যাতায়াত করতে করতে পোড়ামাটির গ্রাম খুঁজে ফেরে কয়েকটি মানুষের জীবন, আকাঙ্ক্ষা ও রহস্যময় যোগসূত্র। প্রাচীন শিল্পীর আঙুলে তৈরি এক নারীমূর্তি, বহু পরে অন্য এক শিল্পীর সামনে এসে দাঁড়ানো এক নারী, এবং বর্তমানের এক মানুষ—যে ক্রমশ আবিষ্কার করে, ইতিহাস কখনও শেষ হয়ে যায় না। পাল-সেন যুগ থেকে ঔপনিবেশিক বাংলা, টেরাকোটার মন্দির থেকে আধুনিক শিল্পের নিঃসঙ্গ স্টুডিয়ো—সময় এখানে সরলরেখায় চলে না। একই মুখ, একই শরীর, একই অসমাপ্ত আকাঙ্ক্ষা কি বারবার ফিরে আসে? নাকি বাংলার মাটি তার শিল্পের ভিতরে গোপন করে রাখে মানুষের এমন এক ইতিহাস, যা কোনও রাজবংশের ইতিহাসে লেখা হয়নি? পোড়ামাটির গ্রাম শিল্প, শরীর, প্রেম, স্মৃতি ও সময়ের ভিতর দিয়ে হারিয়ে যাওয়া এক রহস্যের অনুসন্ধান।]

পিছন ফিরে আর তাকাতে ইচ্ছে করল না মৃন্ময়ের। পিছনে নিশ্চয় কেউ আছে, তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে। ঠিক যেমন, সূর্যাস্তের দিকে মানুষ তাকিয়ে থাকে। ঘাট থেকে ছেড়ে যাওয়া নৌকোর দিকে তাকিয়ে থাকে। মৃত মানুষের জ্বলন্ত চিতার দিকে তাকিয়ে থাকে। কিন্তু চলে যাওয়ার পরে আর পিছনের দিকে তাকিয়ে দেখার ইচ্ছে করে না। কিন্তু সামনেই বা কোন দিকে যাবে সে? যতই উত্তর-দক্ষিণ-পূর্ব-পশ্চিম ভাবা যাক না কেন, আসলে তো কোথাও যাওয়ার কোনও দিক নেই। কারণ এই পৃথিবীতে কোথাও কেন্দ্র নেই। মৃন্ময়ের মনে পড়ে অপূর্বপুর গ্রামে তাদের বাড়িটার কথা। সেই যে একবার মৃন্ময় বাড়ি ছেড়ে চলে এসেছিল কলকাতার কলেজস্ট্রিটের হোস্টেলে, তার পর আর সেই অপূর্বপুরের বাড়িতে তার ফেরা হল না। ফেরা হয়ে ওঠে না অনেক সময়ই। ফিরবে কোথায়? ফেরার কি সত্যই কোনও জায়গা আছে? মানুষ কখন সম্পূর্ণ একা হয়ে যায়? যখন তার কারো কাছ থেকে আর প্রত্যাশা থাকে না। আসলে, ব্যক্তিমন যে সমষ্টির মধ্যে এক সঙ্গতের মতো রয়েছে, সেটি বুঝতে গেলে মানুষকে সম্পূর্ণ একা হতেই হয়। অনেককে নিয়েই তাকে একা হয়ে যেতে হয়। আবার কখনো, এই বোঝাটুকু সহজে আসে না। তার জন্য জীবন তাকে পালক ঝরানোর মতো করে একা করে দেয়। ধীরে ধীরে সে বুঝতে পারে, অনুভব করতে পারে এই পৃথিবীকে, যাকে সে এতকাল অবজ্ঞা করে এসেছে। যাকে সে দেখেছে বহুবার, যে তার সবচেয়ে কাছের, এই প্রকৃতি, যেখান থেকে সে এসেছে, আর যেখানে সে ফিরে যাবে, তার কাছে সে ফিরে যায়।

ফিরে যাওয়া, এক আদিম চিন্তাপ্রবাহ। ফিরে যাচ্ছি আমরা আসলে। কী নিয়ে ফিরে যাচ্ছি? খ্যাতি, আলো, কিছু কবিতা, নাকি কিছু মানুষের কাছ থেকে পাওয়া অপমান? নাকি ভালোবাসা? কী নিয়ে আমরা ফিরে যাচ্ছি ? আসলে ফিরে যাওয়ার কোনো উপলক্ষ্য হয় না।

যাত্রাপথের প্রয়োজনীয় খাদ্য, প্যাকেট, কাপড়, ব্যাগ, জল, ওষুধ এবং কিছু টিকিটের মতো।

সব আসলে ফেলে দিতে হয়। এই যাওয়াটাই মূল। আর কিছু নয়।

মানুষ কখন সম্পূর্ণ একা হয়ে যায়? যখন সে আর একাকী হয়ে অবসন্ন হয় না। যখন সে জানে, সে একা নয়। এই মাটি, আলো, আকাশ, হাওয়া, জল তার বন্ধু।

আর তো কেউ নয়। আর কিছু নয়। আর কোথাও যাওয়ার কথা নেই। কোথাও যাওয়ার কথা না থাকলেও, যেতে হয়। মৃন্ময়ের একবার ইচ্ছে করল পিছন ফিরে তাকিয়ে থাকে। একবার, একটিবার দেখে তার ফেলে আসা ঘরের জানলার দিকে। যদি কেউ সেই শূন্য ফাঁকা ঘর থেকে মুখ বাড়ায়।

কিন্তু না, পিছন ফিরে তাকালে হবে না। মৃন্ময় আসলে তো কোথাও যাচ্ছে না। কিন্তু তাকে যেতে হবে। সে খুঁজতে চলেছে। উত্তর কলকাতার এই অঞ্চলে,  এই বৈঠকখানা রোডের জগবন্ধু বসু নামের ছোট্ট গলির ভিতরে সময় এগোয় না। ঠিক যেভাবে মৃন্ময়ের মনের ভিতরের সময় এগোয়নি কখনো।

এখানে, এমন একটি পুরোনো বাড়িতে মৃন্ময় থাকত, যে বাড়িটারই বয়স দেড়শ বছরের বেশি। যদি কেউ হাঁটতে হাঁটতে এই পুরোনো গলির মুখে কৌতূহলী হয়ে ঢুকে পড়ে জিজ্ঞেস করে, এই বাড়িটা কত শতাব্দী আগের, তাহলে পাড়ার লোক বলবে, বাড়িটার কোনও গাছপাথর নেই। কিন্তু এই ধরনের বাড়ি কখনো হেরিটেজ বাড়ির তকমা পায় না। বরং তকমা পায় ভূতুড়ে বাড়ির। রাস্তা থেকে অনেকটা ভিতরে এই বাড়িটা থাকায়,  কৌতূহলী প্রোমোটারদের নজরও পড়ে না এই বাড়ির উপর। এ বাড়িটা ছিল ভাড়া বাড়ি। ঠিক কত শ বছর আগে কোনও এক মালিক এই বাড়িটা চল্লিশটা পরিবারকে ভাড়া দিয়েছিলেন, তার ইতিহাস কর্পোরেশনের নথি ঘাঁটলে হয়তো পাওয়া যাবে। কিন্তু সেই দশ কুড়ি টাকার ভাড়াতেই দিব্যি চলে গেছে কয়েকটা প্রজন্ম। কিন্তু এখন বাড়িটার ঝুরঝুরে অবস্থা। বাবা-মা চলে যাওয়ার পরে মৃন্ময় এই বাড়িটাতে একলাই থাকত। কাজের মধ্যে বড়বাজারে একটা স্কুলে পড়ানোর কাজ। মৃন্ময়ের বিষয় ইতিহাস। ইতিহাস মৃন্ময়কে মায়ের ভালোবাসার মতো আঁকড়ে ধরে থাকে। ইতিহাসের মধ্যেই ডুব দিয়ে থাকে মৃন্ময়। পুরো নাম মৃন্ময় বসু। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে এম এ। দুহাজার ছয়ে পাশ করে বেরিয়ে স্কুলে চাকরিটা পেয়ে যাওয়ায় আর কিছু করতে চায়নি মৃন্ময়। মৃন্ময়ের ইতিহাস বিষয়ে কিছু কথা বলার আগে, চলে যাওয়া যাক মৃন্ময় এই অবেলায় বাড়ি ছেড়ে একট ছোট্ট ট্রলি ব্যাগ নিয়ে চলেছে কোথায়? অপূর্বপুর গ্রামে? বাবা অমর্ত্য মারা যাওয়ার সময় মৃন্ময়ের দিকে তাকিয়ে একবার শুধু বলেছিলেন, ‘গ্রামে যাস। ওখানে শান্তি আছে’। মায়ের দেরখা সে কোনোদিনই পায়নি। কারণ তাকে জন্ম দিতে গিয়েই তার মা চলে যায়। সবকিছুই এই জগবন্ধু বসু লেনের গলিতেই। এখান থেকেই মেট্রোপলিটান স্কুলে পড়াশুনো। বিদ্যাসাগর কলেজে ইতিহাস নিয়ে ভর্তি হওয়া। সেখান থেকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়। এই হল মৃন্ময়ের আজ পর্যন্ত কাটানো জীবনের কূণ্ডলী। তার বয়স এখন বত্রিশ। যাকে বলে ছেলেদের বিয়ের বয়স। প্রেমে কি পড়েনি মৃন্ময় কারোর? না। তার কারণ হয়তো মৃন্ময়ের ভিতরে থাকা এক অপূর্ব একাকিত্ববোধ, এক নির্জনতা, এক স্বার্থপরতাও বলা যায়। নিজের মনের ভিতরের নির্জনতাকে বজায় রাখার জন্য যে স্বার্থপরতা দরকার হয়, তা মৃন্ময়ের মধ্যে এত বেশি ছিল, যে কোনও বন্ধুকে নিয়েই সে বাড়িতে আসেনি। তেমন ভাবে ভাবলে, মৃন্ময় মনে করতে পারে না, কাউকে, যাকে সে বন্ধু বলতে পারে। এমনকি কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে দেওয়ার পরে হয়তো তার মুখ দেখলেও কেউ চিনতে পারবে না। অস্পষ্ট হয়ে গেছে সে। নিজেও নিজের কাছে সে কি অস্পষ্ট হয়নি? মৃন্ময় কি পারবে নিজের কাছেও ফিরে যেতে? না। আর সে তার চেষ্টাও করে না। কারণ মৃন্ময় নিজের মধ্যেই এমন এক অরূপরতন খুঁজে পেয়েছে, যার সঙ্গে সারাজীবন থেকে যাওয়া যায়।

মৃন্ময় আসলে নিজের স্বপ্নের পিছনে ধাওয়া করছে। ধাওয়া করছে, না বলে, বরং বলা ভালো, বেশ কয়েকদিন ধরেই, সে স্বপ্নে দেখছে এমন কিছু মানুষকে, এমন কিছু চরিত্রকে, যারা তাকে চেনে, মৃন্ময়ও স্বপ্নের মধ্যে তাকে চেনে, কিন্তু বাস্তবে ঘুম ভেঙে যাওয়ার পরে মৃন্ময় কিছুতেই মনে করতে পারছে না, তারা কারা।

তবে একদিন বা দুদিনের স্বপ্ন নয়, মৃন্ময়ের স্বপ্নের মধ্যে ঘুরে ফিরে এসেছে সেই সব জায়গা। সেই সব মাঠ, পোড়া মাটি, পোড়া মাটির উপর অঙ্কণরত শিল্পী। তাদের ছড়া, গান। কিন্তু মৃন্ময় তো তাদের ইতিহাসের কথা জানে না। মৃন্ময় জানে গৌড় পাণ্ডুয়ার ইতিহাস। কারণ সে একবার নয়, বারবার ঘুরে এসেছে একলাখি মসজিদ, আদিনা মসজিদ, হেমতাবাদ থেকে শুরু করে বাংলার পোড়ামাটির মন্দির। দিকনগর গ্রামে গিয়ে সে থেকে যাওয়ার কথাও ভেবেছিল একদিন। কিন্তু এমন ভাবে কখনো স্বপ্নের মধ্যে হানা দেয়নি সেই সব পোড়ামাটির শিল্প আর তাদের শিল্পীরা। বহুবার রাতে ঘুম ভেঙে মৃন্ময় ভেবেছে, কোথায় গেলেন সেই সব শিল্পী? এখনো কি তাঁরা নেই, নাকি তাজমহল নির্মাণের পর যেমন নির্মাণশিল্পীদের আঙুল কেটে ফেলে দেওয়া হত, হাত কেটে ফেলে দেওয়া হত বা অন্য কোথাও শিল্প নির্মাণের পর যেমন শিল্পশ্রমিকদের মৃতদেহের উপরই গড়ে উঠত সুন্দর, তেমনই কিছু ঘটেছে?

মৃন্ময় প্রথম দিকটায় এই সব স্বপ্নকে পাত্তা দিতে চায়নি। বরং সে পড়ার চেষ্টা করেছে। ডেভিড ম্যাকাচ্চন, তারাপদ সাঁতরা। সে জানার চেষ্টা করেছে বাংলার এই সব মন্দির মসজিদের শিল্পীদের নিয়ে ইতিহাস। কোথায় গেলেন তাঁরা? কেন তাঁদের ইতিহাস কোথাও লেখা হয় না। ইতিহাস লেখা হয় কেন শুধু শাসকদের?

কিন্তু সেদিনের পর থেকে আর মৃন্ময় নিজের স্বপ্নকে অগ্রাহ্য করতে পারে না। সেদিন স্বপ্নের মধ্যে এক বৃদ্ধ শিল্পী এসে তাকে বলল, মৃন্ময়, আমাদের সঙ্গে একদিন দেখা করতে এসো। মৃন্ময়ের মনে পড়ে, সে প্রশ্ন করেছিল স্বপ্নের মধ্যেই, আমাকেই কেন বেছে নিলেন? আমার সঙ্গে দেখা করতে চাইছেন কেন? আমি কে? আপনিই বা কে?

সেই বৃদ্ধ শিল্পী বললেন, আরে, আমার নাম সূত্রধর পাল। আমি থাকি গৌড়ে। আমার ঠাকুর্দাও এখানকার। কিন্তু তখন কি আর এমন ছিল গৌড়? তুমি গৌড়ের ইতিহাস জানো তো? আসল বাংলার ইতিহাস?

মৃন্ময় বলল, কিছুটা তো জানি। কিন্তু সে সব কি আর মানুষের ইতিহাস? গৌড়রাজ্যের মধ্যে ছিল অঙ্গ, বঙ্গ, রাঢ় এবং সুহ্ম। সে এক বিরাট রাজ্য। কিন্তু আপনি তো সেই সময়ের বলে মনে হচ্ছে না।

না, কিন্তু আমার রক্তের মধ্যে সেই সময় এখনো রয়েছে। তোমারও রক্তের মধ্যে রয়েছে সেই সময়। কিন্তু তুমি বুঝতে পারছ না। একবার কাউকে না কাউকে উস্কে দিতে হবে। তুমি এসো। এসো আমার কাছে। তোমাকে কাহিনি বলব। কাহিনি। আমরা যা পাথরে খোদাই করে রাখি।

তোমরা তো রামায়ণ মহাভারতের কথা খোদাই করে রাখো মন্দিরের গায়ে।

(একটু হেসে) শুধু কি তাই? তুমি কি দেখোনি, আমাদের কষ্ট যন্ত্রণাও খোদাই করে রাখি? দেখোনি নাকি? একটা কাহিনি বলছি বাইরে, আর আরেকটা কাহিনি বলছি ভিতরে। চোখ থাকতে হবে তো সেই কাহিনিকে বুঝে নেওয়ার জন্য। তেমন ভাবে কেউ দেখে?

কিন্তু আপনি ঠিক এখন কোথায়?

কেন, আমাদের গ্রামে। এই তো একটু আগে কুশান গান শুনছিলাম।

কুশান গান? সেটা কী?

ও মা, এসব ভুলে গেলে? রামায়ণের লব-কুশের আখ্যান নিয়ে যে গান।

এমন গান আছে নাকি?

সে কী, তোমরা শোনোনি বুঝি, বিষহরি গান, কুশান গান, নয়নশ্বরীর পালাগান, বৈষ্টম-বাউদিয়া, বাইদ্যা-বাইদ্যানির গান?

না, তো। এসব তো আমাদের ইতিহাসে পড়ানো হয় না। সাহিত্যেও তো পড়িনি।

তুমি কি বাংলা থেকে অনেক দূরে হারিয়ে গেছ নাকি?

না আমি তো বাংলাতেই থাকি।

একটা গান শুনবে? একে বলে চোর-চুন্নীর গান।

চোর-চুন্নীর গান? সে কী?

আরে, এ গান তো আমি গেয়ে গেয়ে সকলকে মাতিয়ে রাখি গো। তবে ভাষাটা তোমার একটু পুরোনো লাগবে। নাও বুঝতে পারো। কিন্তু শোনো।

দুটো হাত জোর করে সুত্রধর পাল গান গাইতে শুরু করে দিল। গানের তালে তালে তার সাদা দাড়ি নড়ছে। আর ঘুমন্ত মৃন্ময় বোঝার চেষ্টা করছে চোর চুন্নী কে।

“ ও বন্দনা করি চোর-চক্রপতি
চোর চক্রপতিরে তোর পায়ে ভকতি।
পাটের ঠাকুর গায় গারাম
ও তাক বন্দিলে হয় আরাম।
থানের ও থান সিরি বন্দো ঠাকুর বলরাম।
ও বন্দনা করি চোর চক্রপতি।।“

অদ্ভুত তার সুর। বন্দনা করার পর সূত্রধর চোখ মেলে তাকাল মৃন্ময়ের দিকে। মৃন্ময় তখন বিহ্বল।

এবার সে গান গাওয়ার উপক্রম করতেই মৃন্ময় তাকে থামিয়ে বলল, কিন্তু আমি তো অনেককিছুই বুঝতে পারলাম না।

সূত্রধর বলল, “ এ তো এখানকার গান নয়। আরও উত্তরের গান। রাজবংশীদের। কৃষকদের। এসব গান দলবেঁধে গাওয়া হয়। কালীপুজোর পনের দিন আগে থেকে এই গান শুরু হয় আর শেষ হয় কালীপুজোর পর। গ্রামের যে কৃষক বড়লোক, তাকে বলা হয় ‘গিরি’। তার মানে হচ্ছে ধনী। তাঁর বাড়ির বাইরের ঘরে যাকে বলে ডারী ঘর, সেখানে পুরুষ অতিথিরা এসে থাকে। সেখানে এই গানের তালিম চলে। এই দলকে কী বলে জানো তো? গীদাল।

গীদাল? অদ্ভুত সুন্দর শব্দ।

হ্যাঁ। সুন্দর শব্দ। দলে দুজন গায়েন থাকে। দোহার হিসেবে থাকে আরো দু তিনজন। এদের মধ্য থেকেই একজন হয় চোর আর একজন হয় চুন্নী। তাছাড়া থাকে বাদকরা। কতরকম যন্ত্র জানো তো। দোতারা, খোল, বাঁশের বাঁশি, খমক, মারিঞ্জা, জুড়ি। এই চোর ও চুন্নীকে তো সমাজের মাথায় যারা বসে থাকে, তারা কেউ সহ্য করতে পারে না। এরা হল তোমার ভাষায় ইতিহাস। এদের জীবন কোথায় লেখা আছে জানো তো? এদের গানে। কারণ এদের কথা শোনার মতো কেউ নেই। আসলে বাঙালি তো। যত প্রতিবাদ সব গানে আর কবিতায়।

– কিন্তু কাদের বলে?

কেন, গারামকে বলে। গারাম কে জানো তো? গারাম হল গ্রামের দেবতা। আর গৃহদেবী হলেন থান সিরি। বলরাম কে? বলরাম হলেন কৃষিদেবতা।

তার মানে বলছ সমাজের নিম্নশ্রেণির মানুষ অভিযোগ জানায় গ্রামের দেবতা আর গৃহদেবীর কাছে।

কারণ তাদের কেউ নেই গো। আমার তো কেউ নেই। আমি তাই তাদেরই গান গাই। শোনো চোরের গান।

সূত্রধর শুরু করল চোরের গান।

“ হাসি মুখে বিদায় দে
গলার মালা কানের সোনা
আনিব তোর বাদে।
ধওলা বাড়ি করিমগে চুরি
টাকার বাক্স আলমারি
সিন্দুকে গহনা বালা আছে।
হাত দিলে খসিবে তালা
বোধ না পাবে কোন শালা
ভাবিবার হোক না নাগে।।
গলার মালা কানের সোনা
আনিম তোর বাদে।।
চুন্নী এই বছর কিনিম জমি
বার-বিশা-দলদলি,
তুই শেলা হব শাহের গিতথানী।।
দেউনিয়ালার মাহিয়ার মতো
শাড়ি পিন্দাহিম তোর নানা মত
ভাবিবার তোক নানাগে।।

কেমন?

মৃন্ময় স্বপ্নের মধ্যে তাকিয়েছিল সেই বৃদ্ধ লোকটার দিকে। লোকটা মুচকি মুচকি হাসছে।

খুব ভালো। কিন্তু অনেক শব্দই তো বুঝলাম না গো।

আরে, তোমাকে আসল চোর আর চুন্নীর সঙ্গে দেখা করতে হবে। তা না হলে তুমি কী করে বুঝবে গো?

তুমি এ গান কীকরে জানলে? তুমি তো বললে গৌড়ে থাক।

হ্যাঁ। আমি তো গৌড়ে থাকি। মন্দির মসজিদের গায়ে খোদাই করি। মাটি পোড়াই। আঁকি।

তুমি শিল্পী। তুমি গায়ক।

কিন্তু আমাদের জীবন কি তুমি জানো? জানো চোর আর চুন্নীকে? লিখবে তুমি আমাদের ইতিহাস? লিখবে?

ঘুম ভেঙে গেল মৃন্ময়ের সেদিন। ঘুম ভাঙলেও মনে হচ্ছিল উজ্জ্বল রোদের মধ্যে সেই বৃদ্ধ শিল্পী বসে আছেন কোথাও। পিছনে যত দূর দেখা যায় ধানক্ষেত। একটা হালকা গ্রামের আভাও কি দেখা যাচ্ছিল? কিন্তু গানের সুরটা এখনো মাথার মধ্যে ঘুরছে। মৃন্ময় মনের মধ্যে গানটাকে নিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল। চোর ও চুন্নী। এরা কোথায় থাকে? এরা কি চিরকাল চোর এবং চুন্নী হয়েই আছে? না কি এরা এখনো আছে আমাদের এই সময়েও? এই গান কি এখনো গীত হচ্ছে কোথাও?

মৃন্ময় ঘুম থেকে উঠে বসেও ভাবছিল কীভাবে সেই চোর এবং চুন্নীর কাছে যাওয়া যায়? নিজের বউ-এর হাসিমুখ দেখার জন্য চোর বলছে বওলা বাড়ি থেকে চুরি করে নিয়ে আসবে সে। হয়তো তারা একটা ঝুপড়িতে থাকে। কিংবা একটা অতি ভগ্নপ্রায় মাটির বাড়ি।

মৃন্ময় দীর্ঘশ্বাস ফেলে। ইতিহাস তো এদের কথা বলে না। এপাশ ওপাশ করে। উঠে বসে। সিগারেট ধরায়। জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকায়। কিন্তু একটা সরু গলি ছাড়া কিছুই দেখতে পায় না। জানলা দিয়ে একফালি আকাশ দেখা যায় তার। সেই আকাশে একটা ছোট্ট ধ্রুবতারা জ্বলে আছে। চোর এবং চুন্নীর মাথার উপরেও তো জ্বলে আছে এমন ধ্রুবতারা। কোন সেই বাংলা,যেখানে তারা রয়েছে? বাংলার কোথায় গেলে পাওয়া যাবে সেই সূত্রধরকে, সেই চোরকে, সেই চুন্নীকে। আরও এমন অনেক মানুষকে, যাদের ইতিহাস এখনো লেখা হয়নি?

মৃন্ময়ের ভিতরটা অস্থির হয়ে ওঠে। আর কানে সূদূর থেকে ভেসে আসতে থাকে চোর ও চুন্নীর গান।

আধো ঘুম আধো জাগরণের মধ্যে সেই গানের সুর শুনতে শুনতে আবার ঘুমিয়ে পড়ে মৃন্ময়।

“ হায় বিধি কী কাম করিনু
জ্ঞান হারানু করিয়া চুরি
একেত পাচ্ছিনা জাতি
নাকে মুখে দিলেন মুতি
ওকাইতে ওকাইতে দিনু ছাপ করি।
মই ছিনু মোটা, হনু শুটি
টিপিয়া ধরেছে টুঁটি
ত্যাঁও যায় না কেনে মুতের ভিকারী।
ওরে মারিয়া করেছে কালা
তবু কাছে ওরে শালা
আরো দ্যাছে বাঁশ ডেলা উপুরা-উপুরি।।

পরের দিন থেকে মৃন্ময়ের মনে স্থির বিশ্বাস জন্মে গেল, এ জন্মটাই সব কথা নয়। যা দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না, তাও কোথাও না কোথাও ঘটছে। এমনকি তা যদি অতীত হয়, তাহলেও তা বর্তমান। ইতিহাস মানে শুধু মরে যাওয়া, পচে যাওয়া, শ্যাওলা ধরা পাঠ্যপুস্তকের কালির মধ্যে সীমাবদ্ধ এক মৃত কবরখানা নয়, বরং ইতিহাস মানে এক বর্তমান। অতীত আর বর্তমানের মধ্যে, ইতিহাস আর ঘটমান সময়ের মধ্যে হয়তো একটা পাতলা পর্দা আছে, যে পর্দাটাকে সরিয়ে দিয়ে তবেই ইতিহাসকে পাওয়া যাবে। ইতিহাসের মানেটাই পালটে যেতে শুরু করে দিল মৃন্ময়ের মনে। সে আয়নার সামনে গিয়ে টোকা মেরে দেখার চেষ্টা করল প্রথমে আয়নার ভিতর দিয়ে সেই বৃদ্ধের কাছে যাওয়া যায় কিনা। তারপর সে মেট্রোরেলের সুড়ঙ্গ দিয়ে হাঁটার কথাও ভাবল। বাগবাজার ঘাটে গিয়ে সে ভাবল, নিশ্চয় এখানে কুমারটুলির কোনও গলি দিয়েই চলে যাওয়া যায় চোর ও চুন্নীর বাড়ি। কিন্তু কোথাও সে সেই গান আর শুনতে পেল না। গরিব মানুষের ঘর, বাড়ি, জীবন দেখতে দেখতে সে ঘুরে বেড়াতে লাগল কলকাতা শহর। মৃন্ময়, এক অপরিচিত মানুষ এই কলকাতা শহরে, খুঁজে বেড়াতে লাগল আরও কিছু অদৃশ্য অপরিচিত মানুষকে। মৃন্ময়কে যে এই কলকাতা শহরের কেউ চিনতে পারে না, তা সে বুঝে গেছে। আর সে কথা বুঝে গেছে বলেই মৃন্ময় নিশ্চিন্ত থাকে, এই শহরের মধ্যে আনাচে কানাচে সে ঘুরে বেড়াবে। কিন্তু এই ঘুরে বেড়িয়ে তার লাভ কী হবে? তাকে তো খুঁজতে হবে সেই হারিয়ে যাওয়া বাংলাদেশকে। সেই হারিয়ে যাওয়া বাংলা ভাষাকে। তাকে খুঁজে পেতে হবে কোথায় লুকিয়ে আছে থান সিরি। কোথায় লুকিয়ে আছে গারাম। তাকে খুঁজে পেতে হবে বাইদ্যা-বাইদ্যানিকে।

মৃন্ময় অজান্তে কখন তার স্বপ্নের মধ্যে ঢুকে পড়েছে, তা সে নিজেই বোঝেনি। কিন্তু ঢুকে যখন পড়েছে, তখন তাকে বেরিয়ে পড়তেই হবে। তা না হলে, সে লিখতে পারবে না বাংলার ইতিহাস, বাংলার সাধারণ মানুষের ইতিহাস।

মৃন্ময় আর দেরি করল না। বৈঠকখানা রোড থেকে হাঁটা শুরু করল আপাতত তার উদ্দেশ্য হাওড়া স্টেশন। কিন্তু কোথায় যাবে সে উত্তরবঙ্গ না রাঢ়বঙ্গ? রাজবংশীদের দেশে না কি গৌড়? মৃন্ময় জানে না কোথায় যাবে। কিন্তু এটুকু জানল সে অনুসরণ করে চলেছে কাউকে, যে রয়েছে তার মনের মধ্যে। সে অনুসরণ করে চলেছে এমন একজনকে, যে তাকে স্বপ্ন দেখছে। দুটি স্বপ্নের মধ্যবর্তী একটা রাস্তা আছে কোথাও। মৃন্ময়কে সেই রাস্তাকেই খুঁজে বের করতে হবে। মৃন্ময় তো সেখানেই যেতে চায়, যেখানে তার শালভঞ্জিকা আছে। শালভঞ্জিকা নামটা শুনলেই চিরকাল মৃন্ময়ের মনের ভিতরে কে যেন হাতছানি দেয়।

সেই শালভঞ্জিকাও এসেছিল তার স্বপ্নের মধ্যে। আর মৃন্ময় তার ঘুমের মধ্যেই চেয়েছিল চিরকাল ঘুমের দেশে চলে যেতে। সে এক অন্য আখ্যান। শালভঞ্জিকার।

আপাতত সময়ের অমোঘ নির্দেশ মেনে উত্তরের দিকে যাওয়ার এক ট্রেনে চেপে বসেছে মৃন্ময়। সে জানেও না, তারই সঙ্গে চলেছে আরও একজন। যে তাকেই হত্যা করতে চায়।

(ক্রমশ)

poramatrir extra1


Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top