বাড়ি থেকে ঘর – পর্ব ২

ruins of the past and memory

—তুই কি পাগল হয়েছিস? এখনও আমাদের পড়াশোনাই শেষ হল না। এখন থেকেই বিয়ের কথা?
ওর সুন্দর মুখে একরাশ হাসি ছড়িয়ে সুমনা বলেছিল—এখনই বিয়ে করব বলেছি? পড়াশোনা শেষ হোক, তুমি চাকরি করো। তার পর।
—তুই চাকরি করবি না?
সুমনা আবার দেবাশিষকে জড়িয়ে ধরেছিল। বলেছিল—না, চাকরি-বাকরি করব না। তোমার সংসার করব, আমাদের সন্তানদের মানুষ করব। আর… বলেই থেমেছিল সুমনা। দেবাশিষ বলেছিল—কী হল? থামলি কেন? আর কী করবি?
দেবাশিষের বুকে মুখ ঘষতে ঘষতে সুমনা বলেছিল—আর তোমার আদর খাব।
ভাঙা বাড়ির ধ্বংসস্তুপের সামনে দাঁড়িয়ে সুমনাকে খুব মনে পড়ছিল দেবাশিষের। সুমনাকে সেই চাকরি করতেই হল। মাকে নিয়ে দিল্লিতে থাকার সময়েই শুনেছিল সুমনার চাকরির কথা। আর কীই বা সে করতে পারত? বর্ধমান উইমেন্স কলেজের অধ্যাপিকার চাকরি পেয়েছিল সুমনা। তুহিনা খবরটা দিয়েছিল। দেবাশিষ পরে আর কোনো খবর নেয়নি। দিল্লির ময়ূরবিহারে সে তখন মাকে নিয়ে একটা ভাড়ার ফ্ল্যাটে থাকে। তার তখন লক্ষ্য ওখানেই একটা ফ্ল্যাট কেনা। সুমনাও প্রথম দিকে তার খবরাখবর নিত। মাঝে মাঝেই ফোন করত। বর্ধমানে ফেরার কথা বলত। দেবাশিষের দিক থেকে তেমন আগ্রহ দেখতে না পেয়ে আস্তে আস্তে ফোন করা বন্ধ করেছিল। দেবাশিষ তখন সত্যি সত্যিই প্রবাসের নেশায় আসক্ত হয়ে গেছে। চাকরিতে প্রমোশন, দিল্লির গতিময় জীবনযাত্রা সবকিছু তাকে সুমনার থেকে অনেক দূরে সরিয়ে দিয়েছিল।
শেষ যেদিন সুমনার সঙ্গে কথা হয়, সেদিন সুমনাকে খুব গম্ভীর লেগেছিল দেবাশিষের। সে বলেছিল—তুমি তাহলে বর্ধমানে ফিরবে না?
—আপাতত নয়। ভবিষ্যতে কী হবে জানি না।
অনেকক্ষণ সুমনা কোনো কথা বলেনি। দেবাশিষ বলেছিল—কী হল, কথা বলছিস না কেন?
—জানো দেবাদা, বাড়ি থেকে বিয়ের জন্য চাপ দিচ্ছে।
—ভাল তো। ভাল ছেলে দেখে বিয়ে করে নে।

একটু চুপ করে থেকে সুমনা বলেছিল—আচ্ছা। তোমার কথাগুলো শুনে রাখলাম। একটা কথা মনে রেখো দেবাদা, সম্পর্ক মেনটেন করতে হয়, নাহলে ভেঙে যায়।
বাড়িটা কি এই কারণেই ভেঙে গেল? অনেকদিন তো বাড়িটার সঙ্গে কোনো সম্পর্কই ছিল না। মা কতবার বলেছে—মাঝে মাঝে বর্ধমানে গিয়ে বাড়িটা দেখে আসিস। এত বড় বাড়ি! দেখভাল না করলে টিকবে না। আসা হয়নি দেবাশিষের। আজও কি আসত? নেহাৎ বাড়িটা ভেঙে পড়ে গেছে। তাই একটা ব্যবস্থা করার জন্য আসা।
—কেমন আছ দেবাদা?
পিছন থেকে কেউ দেবাশিষকে কথাগুলো বলল। সুমনার গলা না? দেবাশিষ ঘুরতেই সুমনাকে দেখতে পেল। অবাক হয়ে সুমনার দিকে তাকিয়ে রইল দেবাশিষ। একইরকম সুন্দর আছে সুমনা। সেই আগের মতো ছিপছিপে আর ফর্সা। শুধু উজ্জ্বল চোখদুটো এখন চশমার আড়ালে।

ruins of connection


—কী হল? কেমন আছ বল?
দেবাশিষ হেসে বলল—ভাল আছি। তুই কেমন আছিস?
—কেমন দেখছ?
—ভালই তো দেখছি। এখনও আগের মতোই সুন্দরী আছিস।
—কোনোদিনই তুমি আমাকে ভালভাবে দেখলে না দেবাদা। দেখলে এই কথাগুলো বলতে না। যাই হোক, জেম্মা কোথায়?
—মা, তুহিনার বাড়িতে আছে। তোর কলেজ নেই আজ?
—আছে। পরে গেলেও হবে। তুমি চল আমাদের বাড়িতে। কথা আছে।
দেবাশিষকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে সুমনা এগিয়ে চলল।
সুমনাদের দোতলা বাড়িটার সদর দরজা দিয়ে ঢুকেই একটা বেশ বড় ড্রইং রুম। এই ঘরটা খুব সুন্দর। প্রথমেই চোখে পড়বে একটা বেশ বড় সরস্বতীর মূর্তি। চারদিকের দেওয়ালে বইয়ের তাক। অজস্র বই সেখানে। মেঝেতে একটা থ্রি সিটার সোফার দুপাশে দুটো সিঙ্গল সিটার। মাঝে একটা গ্লাসটপ সেন্টার টেবিল। দেবাশিষকে সোফায় বসিয়ে সুমনা ঘরের ভেতরে চলে গিয়েছিল। দেবাশিষ ভাবছিল। এই বাড়িতে সে আগেও এসেছে। তখন বাড়িটা এত ঝকঝকে ছিল না। দোতলাও ছিল না। সুমনার বাবা সুমন্ত রাহা আর তার মা মৈত্রী মুখোপাধ্যায় দুজনেই রাজ্য সরকারি কর্মচারী। এখনও কি তারা চাকরি করছে? নাকি রিটায়ার করে গেছে? দেবাশিষ আন্দাজ করতে বসল। ও যখন দিল্লি গেল, তখন সুমনা গ্র্যাজুয়েশন করছে। সেকেন্ড ইয়ার। সে প্রায় পনেরো বছর আছে দিল্লিতে। মানে, সুমনার বয়স এখন প্রায় পঁয়ত্রিশ। সেই হিসাবে ওর মায়ের অবসরের বয়স না হওয়ারই কথা।
—মাথা নিচু করে কী এত ভাবছ?
সুমনার গলার আওয়াজে মাথা তুলল দেবাশিষ। সুমনার সঙ্গে ওর বাবা, মাও এসেছে। দেবাশিষ উঠে দুজনকে প্রণাম করল। দেবাশিষের মাথায় হাত রেখে সুমনার বাবা বলল—আগে থেকে দেখাশোনা করলে বাড়িটা এইভাবে ভেঙে পড়ত না। কতবার সুমনাকে বলেছিলাম তোমাকে খবর দিতে। চোখের সামনে বাড়িটা থেকে চাপড়া খসে পড়তে দেখে খুব কষ্ট হত।
—খবর দিতে পারতেন। আমতা আমতা করে দেবাশিষ বলেছিল। সে নিজেও জানে এটা কথার কথা। খবর দিলেও কি সে আসত?
সুমনা বলল—খবর দিয়ে কী হত? তুমি কি আসার সময় পেতে?
দেবাশিষ কিছু বলতে পারল না। মাথা নিচু করে রইল। সুমনার মা বলল—তোমরা গল্প কর। আমি অফিসে বেরুচ্ছি।
সুমনার মা চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ওর বাবাও চলে গেল। হয়তো তাকেও অফিসে যেতে হবে। দেবাশিষ বলল—সুমন্তকাকুও অফিসে যাবে?
একটা সিঙ্গল সিটারে বসল সুমনা। বলল—বাবা অনেকদিন আগেই রিটায়ার করে গেছে।
—আচ্ছা। তা, তুই যে চাকরি করবি না বলেছিলিস?
—শুধু এইটুকুই মনে আছে তোমার? আরো তো কিছু বলেছিলাম। সেটা তো হয়নি, তাই বাধ্য হয়েই…
সুমনা কী বলতে চাইছে, দেবাশিষ তা বোঝে। সত্যিই তো, সুমনা দেবাশিষের সংসার করতেই চেয়েছিল। সে সুযোগ পেল কোথায়? দেবাশিষ নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত থেকেছে। দেবাশিষের মধ্যে আজ অপরাধবোধ জাগছে কেন? কেন মনে হচ্ছে তার ভুলেই তাদের বাড়ি ভেঙেছে, সুমনার সঙ্গেও সম্পর্ক ভেঙেছে। সে মাথা নিচু করে বসেছিল। সুমনার চোখে চোখ রাখতে পারছিল না।
সুমনা বলল—তোমাকে যে কথা বলার জন্য ডেকে আনলাম, সেটা শুনবে না?
মাথা তুলল দেবাশিষ। বলল—হ্যাঁ, বল।

—তোমাদের বাড়িটা জরাজীর্ণ হয়ে গিয়েছিল ঠিকই, তাই বলে ওটা নিজে নিজে ভেঙে পড়েনি।
চমকে উঠল দেবাশিষ। কী বলতে চায় সুমনা? বলল—নিজে নিজে ভেঙে পড়েনি মানে?
—মানে খুব সহজ। ওটা ভেঙে পড়তে কেউ সাহায্য করেছে।
—কেন সাহায্য করবে?
—ভাল করে চারদিক দেখে চিন্তা কর দেবাদা। এইরকম প্রাইম লোকেশনে এতটা জায়গা! যে কোনো প্রমোটার লুফে নেবে। বর্ধমানে এখন একের পর এক স্কাইরাইজ হচ্ছে। বাড়িটা তোমাদের সেন্টিমেন্ট। তাই বাড়িটা যতদিন থাকবে, ততদিন তোমরা এটা ভেঙে ফেলার কথা ভাববে না। একমাত্র যদি বাড়িটা না থাকে, তবেই তোমরা অন্যকিছু ভাবতে পার। তাই না?
দেবাশিষ হাঁ করে সুমনার কথা শুনছিল। তার কথায় লজিক আছে। কিন্তু কে এমন কাজ করবে? সুমনাকে সেই কথাই বলল—কিন্তু কে এমন কাজ করবে?
—এসেছ যখন, কয়েকদিন চোখ-কান খোলা রেখে ঘোরাঘুরি কর। সব বুঝতে পারবে।

ruins and reflections of a somber moment

দেবাশিষের মনে তখন ঝড় বইছে। এমন কিছু সে কল্পনাও করেনি। কে হতে পারে?
সুমনা হঠাৎ বলল—তোমাকে একটা ব্যক্তিগত কথা জিজ্ঞাসা করব দেবাদা?
দেবাশিষ এবারে হেসে ফেলল। সুমনা তার অনুমতি নিয়ে ব্যক্তিগত কথা বলবে? বলল—তোর কাছে আবার ব্যক্তিগত বলে আলাদা কিছু আছে নাকি? বল, কী বলবি?
সুমনা একটু চুপ করে থেকে বলল—তুমি বিয়ে করলে না কেন?
দেবাশিষ জানত, সুমনা একদিন না একদিন এই প্রশ্ন করবেই। উত্তরও তৈরি করে রেখেছিল। একটু উদাস হয়ে বলল—সময়ই পেলাম না রে! স্বার্থপরের মতো শুধু নিজের কেরিয়ার নিয়ে ভাবলে কী আর সংসার হয়? বলেই চুপ করে গেল দেবাশিষ। সুমনার দিকে তাকিয়ে রইল একভাবে। সুমনার অস্বস্তি হচ্ছিল। দেবাশিষের থেকে দৃষ্টি অন্যদিকে সরিয়ে বলল—এটা যে সর্বৈব সত্যি নয়, তা তুমিও জান। তুমি কেরিয়ারিস্ট হতে পার, কিন্তু আর যাই হও, স্বার্থপর নও।
—না রে, কেরিয়ারিস্টরা টু সাম এক্সটেন্ট স্বার্থপর হয়। যাকগে, তোর খবর বল? তুইও তো বিয়ে তা করিসনি। কেন?

a moment of warmth in ruins

ক্রমশ

বাড়ি থেকে ঘর – পর্ব ১


Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top