সাঁজোয়া
আজকাল শব্দ অপচয় করতেও দ্বিধা
দাঁড়ি, কমা’র সাথে শিথিল নিঃশ্বাস
চাঁই বাঁধা বরফ বুকে সামনের দিকে এগিয়েও পিছিয়ে আছি তিন পা
মীনচিহ্নিত রাত, আধমরা চাঁদ আর পিশিতলোভীর দিব্যি—
চেনা গলি ঘুঁজি সব মুছে ফেলেছি।
সরিয়ে ফেলেছি গাঢ় সংলাপের পিকদান
বিষাদের সরিৎসাগর এখন আঁচলে বাঁধা
পিশাচ বাগানের কাটাকুটি অভুক্ত পেটে।
নিস্তব্ধ শহরের দেয়ালে বুভুক্ষুর কোনো পোস্টার না সাঁটানোই রীতি –
অকাতরে ডুবে গেছি
দুমড়ে মুচড়ে গিয়েও অবশেষে বাজি রেখেছি— জীবন
এক ইঞ্চি জমি না ছেড়ে ঝলসে নিয়েছি পেলব যা কিছু।
তাই আজকাল অপাংক্তেয় শব্দের বদলে ফাটা বুকের ওপর চাপিয়েছি আগাম যুদ্ধের সাঁজোয়া।
বুনন
খুঁটিনাটি সব কিছু জমানোর মধ্যে ফিনফিনে মায়ার পরত জড়িয়ে থাকে
বাতিল বলে গণ্য করতে গেলেই জমানো জল উপছে আসে
স্থানের সংকুলান হলেও তারা জাঁকিয়ে বসে
-এর গায়ে, তাকে সরিয়ে, কোল কুঁজো হয়ে।
তবু তারা থাকে।
অথচ এইসবের মধ্যে মুছে যেতে থাকে অগণিত শব্দ আকর
মূল থেকে উৎপাটিত হয়
বিক্ষিপ্ত টুকরো ইতস্তত ছড়িয়ে ফাঁক ফোকর রেখে যায়।
অন্তস্থলের আফসোসের কাছে হাঁটু মুড়ে বসি—
জোড়াতালি দেবার আশায় ক্রমাগত খুঁজে চলি ভাঙাচোরা অক্ষর
যদি কখনো অক্ষর বৃত্তের স্মৃতিশিল্প বুনে নিতে পারি।
ঘেরাটোপ
দীর্ঘ সময়ের সহবাসে লেগে থাকে পিচ্ছিল শ্যাওলা
তবু তুলসীমঞ্চে জল ঢালার মত তাতেই জীবন ঢেলে আসি রোজ।
আলো— ভালো যা কিছু—
সব পায়ে পায়ে পিছু হটে
সময় মতো, নিয়ম মতো
আসলে এসব কৃচ্ছ্রসাধনের মুখোশে অজুহাত।
চীনে মাটির ফুলদানি উপছে পড়ে কাঁকর আর কাঁচের স্রোত
তার ভেতরের বাতাসের চলাফেরায় সৃষ্ট শব্দে অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠে
ভাবি এমন জীবনে সুখী আলোর কনসিলার ঘষা সহজ নয় মোটেও
তবু আড়াল রাখতে এটুকু পারতেই হয়।
অচেনা পরিসরে সাহসে ভিড় দিয়ে পা ফেলাই যায়
উপহার হিসেবে পাওয়া যায় কয়েকটা আলোমাখা টুকরো মেঘের সকাল, ভেজা বালিতে আগামীর পরিকল্পনা
সব শেষ হলে সরু করে কেটে রাখা হৃৎপিণ্ডের টুকরো।
পরিশেষে ফিরতে হয়
শ্যাওলা জমা প্রাচীন সহবাসের ঘেরাটোপে।
দ্বৈরথ শেষে
মেঘমাখা বিকেল হাতে গুঁজে দেয় হলদেটে খাম
অস্ফুট সুবাসে লজ্জা ত্যাগ করে উঁকি দেয় কালচে গোলাপের কঙ্কাল
অ্যালবামের পাতায় পাতায় একটা সোনা রঙ মাখা মুখ
অনাবিল সুখের রেশ ছড়িয়ে পড়ে
অন্তর্গত দুঃখের সুর বেজে যায়।
নিষ্ফল পরিব্রাজন শেষে ধেয়ে আসে অন্ধতামস রাত
গাঢ় নীলে মিশে যায় আমাদের সমকালীন দ্বৈরথ
শুকনো ফাটা ঠোঁটে আর উচ্চারিত হয় না—
মধু ক্ষরন্তি সিন্ধবঃ।
বুঝি দূরত্বের পরিমাপে তুমি এখন ঈশ্বর বৃত্তে।
নিষ্পলক মণিতে নেমে আসে জ্যোৎস্নারঙ
হয়তো এই জ্যোৎস্নারঙ একটি প্রলোভন
কুহক ছায়ায় নিজেকে বিলীন করার।
বিগত সব দ্বন্দ্ব অপনেয় হোক
আসন্ন দিনলিপি যত্নে রাখুক আমাদের অন্তরের উৎসারিত আহির শক্তির উৎসব।
অদূরে যে বেজে যায় কানু মহারাজের মরমিয়া বাঁশির সুর।
উপশম
উজ্জ্বল পরিপাটি একটা সংসারের স্বপ্নে বিভোর দৃষ্টি
মেয়েটির অন্তঃস্থল এঁকে ফেলেছে সূক্ষ্ম লেসের কাজ করা ঢাকনা দেওয়া বেতের চেয়ার,
ধোঁয়া ওঠা উষ্ণ পেয়ালা,
স্বাস্থ্যবান ঘুমন্ত শিশুর দেয়ালা তার কানে বেজে চলেছে।
এইসব থেকে চোখ সরালেই দেখে তার শিয়রে শুধু রাত জাগা ঘুমের আস্তরণ
দুয়ারে নকশা কাটা অজস্র শূন্যের নিঃশব্দ বিচরণ।
অথচ তার জানালার ঠিক বাইরে পড়ে আছে বিস্তৃত হলদে গম ভর্তি মাঠ
কালো ফিতের মত রাস্তার ধারে লাল টালির সাদা সাদা বাড়ি
গেটের ওপর অকাতরে ঝরে পড়ছে ম্যাজেন্টা বোগেনভিলিয়া।
এর কোনকিছুই তাকে বিচলিত করতে পারেনি
অতুল বৈরাগ্যে সে নিজেকে নিমজ্জিত করে যাবতীয় শিকড় বাকর ছিঁড়ে ফেলেছে।
সে কখনও ভেবে দেখিনি মুঠো ভর্তি স্লিপিং পিলের বদলে একটি নোঙর বাঁধা অমেয় উপশমের কারণ।



